বিজ্ঞাপন

উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততা ও অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততা ও অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততাকে প্রধানত পরিবেশ, কৃষি ও জীবিকার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রচলিত নীতি-আলোচনায় ফসলহানি, চিংড়ি চাষ, বাঁধের ক্ষতি, খাবার পানির সংকট এবং অভিবাসনের মতো বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্বেগ এখনো যথার্থ।

তবে দক্ষিণ খুলনা, বিশেষ করে রামপাল, মোংলা ও আশপাশের উপকূলীয় জনপদের অভিজ্ঞতা আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, লবণাক্ততাকে এখন জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রজননস্বাস্থ্য, মাতৃনিরাপত্তা, প্রতিবন্ধিতা, অসংক্রামক রোগ (NCD) এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল সংক্রামক রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে।

এটি কোনো চূড়ান্ত কার্যকারণ সম্পর্কের দাবি নয়; বরং বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। উপকূলীয় পরিবারগুলো একই সঙ্গে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে—লবণাক্ত খাবার পানি, অতিরিক্ত তাপ, অনিশ্চিত জীবিকা, মৌসুমি পানিসংকট, পরিবর্তিত রোগ-পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকার।

জনস্বাস্থ্যের মূল প্রশ্ন হলো, এই সম্মিলিত ঝুঁকিগুলো মানুষের অনিবার্য দুর্ভোগ হিসেবে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ কি সেগুলো যথাযথভাবে গবেষণা করতে প্রস্তুত?

আমি The Journal of Climate Change and Health-এ প্রকাশিত যে গবেষণাপত্রে সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলাম, সেখানে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশকে ‘কমিউনিটি প্ল্যানেটারি হেলথ’-এর একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত লবণাক্ততা চিংড়ি চাষ, শুষ্ক মৌসুমে আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ হ্রাস, বাঁধ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাসের কারণে আরও তীব্র হয়।

দক্ষিণ খুলনায় এসব কারণ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এগুলো খাবার পানি, রান্না, খাদ্যব্যবস্থা, গৃহস্থালি শ্রম, গর্ভকালীন পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগঝুঁকির মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

গর্ভাবস্থা ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগগুলোর একটি হলো গর্ভাবস্থা। রামপাল ও মোংলার কমিউনিটি পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, গর্ভবতী নারীরা একই সঙ্গে কয়েকটি ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন—লবণাক্ত খাবার পানি, খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, তাপজনিত চাপ, নিরাপদ পানি সংগ্রহে দীর্ঘ পথ অতিক্রম, পর্যাপ্ত অ্যান্টেনেটাল ফলোআপের অভাব, দারিদ্র্য এবং উচ্চ রক্তচাপ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হওয়া।

অনেক পরিবার লবণাক্ত পানিকে গর্ভাবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখে না। অনেক নারীর নিয়মিত রক্তচাপও পরীক্ষা করা হয় না। ফলে শরীর ফুলে যাওয়া, মাথাব্যথা বা দুর্বলতার মতো লক্ষণ গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক গর্ভকালীন অসুবিধা হিসেবে উপেক্ষিত হতে পারে।

প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া কেবল উচ্চ রক্তচাপ নয়; এটি গর্ভাবস্থার একটি গুরুতর উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা, যা মা ও শিশু উভয়ের জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এটি জরুরি প্রসব, অপরিণত প্রসব, ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মাতৃজটিলতা এবং নবজাতকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

উপকূলীয় উপজেলাগুলোয় যেখানে পরিবহন, রেফারেল এবং জরুরি প্রসূতি সেবা এখনো অসম, সেখানে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন যেকোনো পরিবেশগত কারণই স্বাস্থ্যসমতা ও মানবনিরাপত্তার বিষয়।

অসংক্রামক রোগ ও পানির নিরাপত্তা

উদ্বেগটি শুধু গর্ভাবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত একটি কোহর্ট গবেষণায় খাবার পানিতে বেশি সোডিয়াম গ্রহণ এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য এটি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক পরিবার লবণাক্ত পানিকে গর্ভাবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখে না। অনেক নারীর নিয়মিত রক্তচাপও পরীক্ষা করা হয় না। ফলে শরীর ফুলে যাওয়া, মাথাব্যথা বা দুর্বলতার মতো লক্ষণ গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক গর্ভকালীন অসুবিধা হিসেবে উপেক্ষিত হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। লবণাক্ত পানি যদি জনসংখ্যার গড় রক্তচাপ সামান্য পরিমাণেও বাড়ায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর জনস্বাস্থ্যজনিত প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। তাই লবণাক্ত অঞ্চলে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না।

প্রতিবন্ধিতা: অনুসন্ধান প্রয়োজন, অনুমান নয়

প্রতিবন্ধিতার বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১.৪৩ শতাংশ মানুষের অন্তত একটি প্রতিবন্ধিতা রয়েছে, আর খুলনা বিভাগে এই হার সর্বোচ্চ-১.৭৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রতিবন্ধিতা ও লবণাক্ততার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না।

প্রতিবন্ধিতার কারণ বহু ধরনের—জেনেটিক, জন্মকালীন, পুষ্টিগত, সংক্রামক, আঘাতজনিত, পরিবেশগত ও সামাজিক। তবে খুলনা বিভাগে তুলনামূলক বেশি প্রতিবন্ধিতার হার প্রশ্ন তোলে, জলবায়ু-সম্পর্কিত পরিবেশগত ঝুঁকি, মাতৃ উচ্চ রক্তচাপ, জন্মকালীন জটিলতা, শিশুপুষ্টি, সংক্রমণ এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক কি রয়েছে, যা এখনো যথেষ্টভাবে গবেষণা করা হয়নি।

বাংলাদেশকে একই সঙ্গে অস্বীকার এবং অতিরঞ্জন—দুই প্রবণতাই এড়িয়ে চলতে হবে। প্রাথমিক তথ্য ছাড়া লবণাক্ততা খুলনায় প্রতিবন্ধিতার কারণ, এ কথা বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল হবে। আবার পরিবেশগত পরিবর্তন প্রজননস্বাস্থ্য, শিশুর বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ধরনকে প্রভাবিত করছে কি না, সেই সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বহীন হবে।

নৈতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক পথ হলো এ বিষয়গুলো মহামারিবিদ্যা, কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ, ভূ-স্থানিক তথ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার রেকর্ড ব্যবহার করে সতর্কতার সঙ্গে গবেষণা করা।

ডেঙ্গু আমাদের কী শিক্ষা দেয়

ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বহু বছর ধরে ডেঙ্গুকে মূলত শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হতো, যা এডিস মশা ও নগর পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাব সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশে অস্বাভাবিকভাবে ডেঙ্গু বৃদ্ধির কথা জানিয়েছিল, যেখানে দেশের ৬৪টি জেলাতেই আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। তারা বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো পরিবেশগত অবস্থাকে মশার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুকূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

২০২৪ সালেও বাংলাদেশ বড় ধরনের ডেঙ্গু ঝুঁকির মুখে পড়ে। শিক্ষা হলো—জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ পুরোনো ‘শহর বনাম গ্রাম’ বা ‘মৌসুমি বনাম ব্যতিক্রমী’ বিভাজন অতিক্রম করতে পারে।

মূল সমস্যা: খণ্ডিত চিন্তাভাবনা

মূল সমস্যা হলো বিভিন্ন খাতের বিচ্ছিন্নতা। পানি বিশেষজ্ঞরা লবণাক্ততা নিয়ে গবেষণা করেন, কৃষিবিদরা ফসলহানি নিয়ে, জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে; অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীরা উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, কিডনি রোগ, ডেঙ্গু ও প্রতিবন্ধিতার চিকিৎসা করেন। কিন্তু রামপাল, মোংলা ও অন্যান্য উপকূলীয় এলাকার পরিবারগুলো এসব ঝুঁকি আলাদাভাবে অনুভব করে না, তাদের জীবনে সব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত।

একজন গর্ভবতী নারী কোনো পৃথক একাডেমিক শাস্ত্রের মধ্যে বসবাস করেন না। তিনি একটি পরিবারের নির্দিষ্ট পানির উৎস থেকে পানি পান করেন, সেই পানি দিয়ে রান্না করেন, একই পরিবেশে গর্ভধারণ করেন এবং একই স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন।

এই কারণে দক্ষিণ খুলনাকে একটি উপকূলীয় জলবায়ু-স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা Coastal Climate-Health Observatory-এর অগ্রাধিকার অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি কেবল তথ্য সংগ্রহের প্রকল্প হলে চলবে না। এখানে পরিবারভিত্তিক পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য নজরদারি, রক্তচাপ মূল্যায়ন, কিডনি কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ, জন্ম ফলাফল নিবন্ধন, প্রতিবন্ধিতা ও শিশুবিকাশ মূল্যায়ন, ডেঙ্গু ও বাহক মশা পর্যবেক্ষণ এবং লবণাক্ততার ভূ-স্থানিক মানচিত্রায়নকে সমন্বিত করতে হবে। একই সঙ্গে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করতে হবে।

মাদের গ্রাম স্বাস্থ্য সেবা প্রকল্প: একটি সামাজিক গবেষণাগার

রামপাল অঞ্চলে ‘আমাদের গ্রাম’ ইতিমধ্যে এক ধরনের সামাজিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করছে। কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং স্থানীয় মানুষের আস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি লবণাক্ততা ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।

তবে একটি সামাজিক গবেষণাগার জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে না। এটি প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, কমিউনিটিকে সংগঠিত করতে পারে, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করতে পারে এবং বাস্তবসম্মত মডেল পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা পরিষদ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আন্তঃবিষয়ক ও জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

কী ধরনের গবেষণা প্রয়োজন

প্রথমত, পরিবারভিত্তিক খাবার পানির লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করতে হবে। শুধু নদী, পুকুর বা মাটির লবণাক্ততা জানা যথেষ্ট নয়। মানুষ বাস্তবে কোন পানি পান করছে, মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে পানির উৎস কীভাবে বদলায়, পরিবারগুলো নলকূপ, পুকুর, বৃষ্টির পানি, কেনা পানি নাকি একাধিক উৎসের মিশ্রণ ব্যবহার করছে—এসব জানা জরুরি। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের সোডিয়াম গ্রহণের মাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিও গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত।

পানি বিশেষজ্ঞরা লবণাক্ততা নিয়ে গবেষণা করেন, কৃষিবিদরা ফসলহানি নিয়ে, জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে; অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীরা উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, কিডনি রোগ, ডেঙ্গু ও প্রতিবন্ধিতার চিকিৎসা করেন। কিন্তু রামপাল, মোংলা ও অন্যান্য উপকূলীয় এলাকার পরিবারগুলো এসব ঝুঁকি আলাদাভাবে অনুভব করে না, তাদের জীবনে সব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত।

দ্বিতীয়ত, উচ্চ লবণাক্ততাযুক্ত ইউনিয়নগুলোয় গর্ভাবস্থা পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করতে হবে। প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, সম্ভব হলে প্রস্রাব পরীক্ষা, নিরাপদ পানি বিষয়ে পরামর্শ এবং সুস্পষ্ট রেফারেল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অপরিণত প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম, মৃত সন্তান প্রসব, নবজাতক জটিলতা এবং মাতৃজটিলতার মতো জন্মফলাফল এমনভাবে নথিভুক্ত করতে হবে, যাতে সেগুলোর সঙ্গে পরিবারভিত্তিক পানি ব্যবহার ও অন্যান্য সামাজিক নির্ধারকের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা যায়।

তৃতীয়ত, জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমের মধ্যে অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, কিডনি কার্যকারিতার সূচক, খাদ্যে লবণ গ্রহণ এবং নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা—এসবকে একই সঙ্গে গবেষণা করা উচিত। লবণাক্ত এলাকায় নিরাপদ খাবার পানিকে শুধু WASH কার্যক্রম নয়, বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

চতুর্থত, প্রতিবন্ধিতা ও শিশুবিকাশ নিয়ে গবেষণা সম্প্রসারণ করতে হবে। খুলনা বিভাগে তুলনামূলক বেশি প্রতিবন্ধিতার হার অনুমানের নয়, বরং সুপরিকল্পিত অনুসন্ধানের দাবি রাখে। জন্ম-ইতিহাস, মাতৃজটিলতা, নবজাতক সেবা, শিশুপুষ্টি, সংক্রমণ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং প্রাথমিক সহায়তামূলক সেবার প্রাপ্যতা—সবগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এই গবেষণা অবশ্যই নৈতিকভাবে এবং কোনো ধরনের কলঙ্ক তৈরি না করে পরিচালিত হওয়া উচিত।

পঞ্চমত, ডেঙ্গু নজরদারিকে শহরকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাহকবাহিত রোগের ঝুঁকির ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। উপকূলীয় ও আধা-গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি পর্যায়ে মশা পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু-তথ্যনির্ভর প্রাদুর্ভাব প্রস্তুতি এবং পানি সংরক্ষণ ও মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বছরব্যাপী জনসচেতনতা প্রয়োজন।

জলবায়ু সংকটকে আমরা প্রায়ই কার্বন, তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভাষায় বর্ণনা করি। কিন্তু উপকূলীয় বাংলাদেশে এই সংকট আরও দৃশ্যমান হয় একজন গর্ভবতী নারীর পানির গ্লাসে, অ্যান্টেনেটাল সেবায় মাপা তার রক্তচাপে, সময়ের আগেই জন্ম নেওয়া নবজাতকের মধ্যে, বিকাশে সহায়তা প্রয়োজন এমন একটি শিশুর জীবনে, নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে না জানা কিডনি রোগীর বাস্তবতায় এবং এমন জায়গায় জন্ম নেওয়া মশায়, যেখানে আগে তা প্রত্যাশিত ছিল না। এগুলো আলাদা গল্প নয়; এগুলো একই উদীয়মান জলবায়ু-স্বাস্থ্য বাস্তবতার অংশ।

দক্ষিণ খুলনা আমাদের সতর্ক করছে। রামপাল ও মোংলাকে প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এগুলো এমন অগ্রবর্তী ক্ষেত্র, যেখানে বাংলাদেশে লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার সুযোগ রয়েছে। এখানে আমরা যা শিখব, তা উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ সুরক্ষিত করতে সহায়তা করতে পারে।

রেজা সেলিম : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আমাদের গ্রাম ক্যান্সার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রামপাল, বাগেরহাট