কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায়, তবুও জনবল সংকট

চট্টগ্রামের দুই পাসপোর্ট কার্যালয়ে প্রতিদিন আনাগোনা থাকে কয়েক হাজার সেবাপ্রার্থীর। সরকার প্রতি বছর এখান থেকে ১৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায়। অথচ নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাসপোর্ট সেবা পেতে পদে পদে ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সর্বমহল বিষয়টি অবহিত থাকলেও সমাধান নেই কোথাও!
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামের দুই কার্যালয়ে পাসপোর্টের সেবা পেতে এমন ভোগান্তি কেন? সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট কর্মকর্তা ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত জনবল সংকটই ভোগান্তির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি কেউ কেউ পুরনো সিস্টেমকে দায়ী করেছেন।
জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পাসপোর্ট কার্যালয় আছে দুটি। নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয়। অপরটি অবস্থিত নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকায়, আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়। উভয় কার্যালয়ে প্রতিদিন আবেদন পড়ে গড়ে এক হাজারের বেশি। এ ছাড়া, প্রায় সমানসংখ্যক লোক পাসপোর্ট ডেলিভারি নিতে আসেন। প্রতিদিন হাজার হাজার সেবাপ্রার্থীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট ও বিতরণ সেকশনে কর্মরতদের সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের কথাকাটাকাটি যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পাসপোর্ট কার্যালয় আছে দুটি। নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয়। অপরটি অবস্থিত নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকায়, আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়। উভয় কার্যালয়ে প্রতিদিন আবেদন পড়ে গড়ে এক হাজারের বেশি। এ ছাড়া, প্রায় সমানসংখ্যক লোক পাসপোর্ট ডেলিভারি নিতে আসেন। প্রতিদিন হাজার হাজার সেবাপ্রার্থীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট ও বিতরণ সেকশনে কর্মরতদের সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের কথাকাটাকাটি যেন নিত্যদিনের ঘটনা
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জনবল রয়েছে। কিন্তু পাসপোর্ট কার্যালয়ের চিত্র ভিন্ন। যথাযথ সেবা পেতে এ অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়ার দাবি সেবাপ্রার্থীদের। এটি করতে পারলে নাগরিকদের গুণগত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দুই কার্যালয়ে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে পাসপোর্টের আবেদন জমা হয় ৮৭ হাজার ৪৮টি। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৫৩ কোটি ৫১ লাখ ৫২ হাজার ২৫৬ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে পাসপোর্টের আবেদন জমা হয় এক লাখ ৪৩ হাজার ১০০টি; বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৯৩ কোটি ২৬ লাখ ৮০ হাজার ৬ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাসপোর্টের আবেদন জমা হয় এক লাখ ৪৯ হাজার ৯২১টি; বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৯৭ কোটি ৭১ লাখ ৩৭ হাজার ১০১ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাসপোর্টের আবেদন জমা হয় এক লাখ ৬৭ হাজার ১৭৭টি; বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ১০৮ কোটি ৯৬ লাখ ছয় হাজার ১৮৭ টাকা। সবমিলিয়ে কার্যালয়টিতে চার অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৬টি আবেদনের বিপরীতে সরকারের কোষাগারে জমা হয় ৩৫৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ টাকা।
এর বাইরে চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিদেশিদের ভিসা ইস্যু বাবদ দুই অর্থবছরে এ কার্যালয় থেকে আয় হয়েছে ছয় কোটি ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ টাকা। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে চার হাজার ৮৮২টি ভিসা ইস্যু হয়। রাজস্ব আদায় হয় দুই কোটি ৪১ লাখ ৬২ হাজার ৩৯১ টাকা। এ ছাড়া, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৫৬৫টি ভিসা ইস্যু হয়। রাজস্ব আদায় হয় তিন কোটি ৬৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৬ টাকা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পাঁচ বছরে এক লাখ ২১ হাজার ৯২টি আবেদনের বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৯ কোটি ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ২৫০ টাকা। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৮২টি আবেদনের বিপরীতে চার লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা, ২০২১ সালে ৭৬৬টি আবেদনের বিপরীতে ৪৪ লাখ চার হাজার ৫০০ টাকা, ২০২২ সালে এক হাজার ৫৭৫টি আবেদনের বিপরীতে ৯০ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকা, ২০২৩ সালে ছয় হাজার ২৬টি আবেদনের বিপরীতে তিন কোটি ৪৬ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫০ টাকা এবং ২০২৪ সালে এক লাখ ১২ হাজার ৬৪৩টি আবেদনের বিপরীতে ৬৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয় থেকে গত চার অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৬টি আবেদনের বিপরীতে সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে ৩৫৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ টাকা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পাঁচ বছরে এক লাখ ২১ হাজার ৯২টি আবেদনের বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৯ কোটি ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ২৫০ টাকা
পাসপোর্ট কার্যালয় দুটির প্রতিদিনের চিত্র
সরেজমিনে দুই কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, এনরোলমেন্ট ও ডেলিভারি সেকশনের সামনে সারাদিনই লম্বা লাইন থাকে। বিপরীতে সীমিত সংখ্যক জনবল দিয়ে তাদের সামলানোর চেষ্টা করে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ। স্বাভাবিকভাবে একজনের এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শেষ করতে আট থেকে ১০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু আবেদনকারীদের চাপে এ কাজ শেষ করতে হয় তিন থেকে পাঁচ মিনিটে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। কোনো কোনো সময় কর্মকর্তারা মেজাজও হারিয়ে ফেলেন। ঠুনকো অভিযোগে আবেদনকারীদের ফেরত পাঠান। ফলে আবেদনকারী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয় কথাকাটাকাটি।
আরও পড়ুন
আবার দুপুর হলে পালাবদল করে লাঞ্চ ও নামাজের বিরতিতে যান কর্মকর্তারা। এ সময়ও সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। তাদের দাঁড় করিয়ে রেখে লাঞ্চ বা নামাজে যাওয়ায় নতুন করে বিপত্তি বাধে। সেবাপ্রার্থীদের অনেকে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। বিপরীতে প্রতিদিনের কাজের চাপে কর্মকর্তাদের মেজাজও খিটখিটে থাকে। ফলে কথাকাটাকাটি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।
পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ কার্যালয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মোট ১৬ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে একজন উপ-পরিচালক ও একজন উপ-সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এ ছাড়া, জনবল কাঠামোতে সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও এখানে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। এ কার্যালয়ে ইন্টারভিউ শাখায় দুজন, এনরোলমেন্ট শাখায় ছয়জন এবং বিতরণ শাখায় কাজ করছেন দুজন। বাকিরা প্রশাসনিক অন্যান্য শাখায় কাজ করেন।
পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন বিভাগের উপ-পরিচালক এবং পাঁচলাইশ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার এখানে গড়ে ৫০০ জন আবেদনকারী আসেন। প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ ডেলিভারি নিতে আসেন। অথচ বিপুলসংখ্যক সেবাপ্রার্থীকে সরাসরি সেবা দেওয়ার লোক আছেন মাত্র আটজন। বিশেষ করে ৫০০ আবেদনকারীর এনরোলমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করেন মাত্র ছয়জন। এক্ষেত্রে একজনকে প্রায় ১০০-এর কাছাকাছি লোককে সেবা দিতে হয়। ভালোভাবে একজন আবেদনকারীর এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শেষ করতে ১০ মিনিটের মতো সময় লাগে। কিন্তু অতিরিক্ত চাপে সেটিও সম্ভব হয় না।
‘সবচেয়ে বেশি বিপত্তি বাধে লাঞ্চের সময়। এ সময় এনরোলমেন্ট শাখায় থাকেন তিনজন, আর বিতরণ শাখায় মাত্র একজন। সেবাপ্রার্থীরা অনেক সময় বাস্তবতা বোঝেন না। তাদেরও খাওয়া-দাওয়া কিংবা নামাজের বিষয় থাকে। উল্টো তারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।’
আরও পড়ুন
মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই। এ কার্যালয়ের অধীন এলাকাগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ লোক পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে আসেন। প্রায় সমানসংখ্যক লোক ডেলিভারি নিতে আসেন। প্রতিদিন প্রায় ১২০০ সেবাপ্রার্থীর সরাসরি চাপ সামলান কর্মকর্তারা। অথচ এ কার্যালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে আছেন ১৯ জন। এর মধ্যে এনরোলমেন্ট ও বিতরণ শাখায় কাজ করেন সাত থেকে ১২ জন।
সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়ার দাবি
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের দুই কার্যালয়ে আবেদনকারীদের চাপ বেশি দেখা যায়। অথচ ঢাকার কার্যালয়গুলো একটি সিস্টেমের মধ্যে চলে। এখানে আবেদনকারীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী এনরোলমেন্টের শিডিউল নিতে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে কার্যক্রম শেষ করতে পারেন। কিন্তু চট্টগ্রামে এ সিস্টেম নেই। এখানে আবেদনকারী আগে থেকে শিডিউল নিতে পারেন না। যে কেউ যে কোনো দিন এনরোলমেন্ট কার্যক্রমের জন্য হাজির হন। ফলে একজন আবেদনকারীকে সকালে এসে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।
মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট কার্যালয়ে আসা কয়েকজন আবেদনকারী জানান, একজন আবেদনকারীকে লাইনে দাঁড়ানোসহ ইন্টারভিউ ও এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শেষ করতে দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দেওয়া হলে সেবাপ্রার্থীকে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হতো না। যে যার সময়ে এসে কার্যক্রম শেষ করতে পারত।
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান সাইদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার আওতাধীন পাসপোর্ট কার্যালয়ে সেবার মান বাড়াতে নিয়মিত বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। নাগরিকদের গুণগত সেবা নিশ্চিত করতে নিজেই সেবাপ্রার্থীদের নানা জটিল সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকি। জনবল সংকট আছে, এটা ঠিক। এনরোলমেন্ট ও বিতরণ শাখায় সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। এখানে সেবাপ্রার্থীদের সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।
চট্টগ্রামে শিডিউল সিস্টেম চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি আগে একবার করা হয়েছিল। এটির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও রয়েছে। আমাদের এখানে প্রতিদিন যতসংখ্যক আবেদনকারী আসেন, তাদের সবাইকে আমরা সেবা দিতে পারি। কাউকে ফেরত যেতে হয় না। তাই এটি আপাতত বন্ধ রয়েছে।’
এমআর/