ব তে বিপিএল ব তে বকেয়া

২৬ জানুয়ারি রোববার। ঢাকায় ফিরতি পর্বের প্রথম দিনের বিপিএল মাঠে গড়ানোর অপেক্ষা। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টেবিল টপার রংপুর রাইডার্সের মুখোমুখি হওয়ার কথা দুর্বার রাজশাহীর। তার আগেই পদ্মাপাড়ের ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে ঘিরে তুমুল শোরগোল। নিজেদের ম্যাচের দিন আচমকা বাক্স-পেটরা ঘুছিয়ে হোটেল বদল। যা নিয়ে নাখোশ ছিলেন খোদ ক্রিকেটাররাও। এর মধ্যেই জানা যায়, পারিশ্রমিক বকেয়া থাকায় ম্যাচ বর্জন করছেন রাজশাহীর বিদেশি ক্রিকেটাররা।
ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার মধ্যে ওইদিনই রাজশাহীর লোগো সংবলিত খাম হাতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে একটি গ্রুপ ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন দলটির প্রথম দিককার অধিনায়ক এনামুল হক বিজয়। পোস্ট করা ছবির ক্যাপশন ছিল, ‘সবকিছু ঠিক আছে, লে ঘিরে লে।’
বুঝাই যাচ্ছিল, রাজশাহীর দেশি ক্রিকেটাররা নিজেদের সম্মানীর টাকা পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। অবশ্য বিজয়ের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে একজন লিখেছিলেন, ভাই খামটা আগে খুলে দেখেন, ভেতরে খালি নাকি কিছু আছে! রাজশাহী মালিক পক্ষের নানা কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখলে এমন মন্তব্যকে যে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না সেটাই যেন প্রমাণ হলো আরও পরে এসে।
গতকালই জানা যায়, রাজশাহীর দেশী ক্রিকেটাররা পারিশ্রমিকের খাম হাতে যে ছবি দিয়েছিলেন, সেখানে থাকা চেকের মাধ্যমে টাকা পাননি তারা। ফ্র্যাঞ্চাইজি সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ব্যাংকে দলের পক্ষ থেকে দেওয়া চেক জমা দিয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। সেই চেকের টাকা নিজেদের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আবারও চেক বাউন্স (চেক ফেরত বা ডিজওনার) হয়েছে। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে দলের কোনো ক্রিকেটার সেভাবে মুখ খুলতে চাননি। পরে রাজশাহীর ম্যানেজার মেহেরাব হোসেন অপি খোলাখুলি কিছু না বললেও তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
আজ (বুধবার) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহীর এক ক্রিকেটার ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন, 'চেক তো বাউন্স করেছে। তবে আজকের দিন পর্যন্ত ডিএ (দৈনিক ভাতা) ক্লিয়ার করেছে। গতকাল রাতেই পরিশোধ করেছে তারা। এ ছাড়া পরবর্তী ম্যাচে খেলার সুযোগ হলে তার আগেই পারিশ্রমিকের টাকা পরিশোধ করবেন এমনটাই জানানো হয়েছে। তবে সেটা চেকে নয় ক্যাশেই করবেন বলে জানিয়েছে মালিকপক্ষ।' শেষ পর্যন্ত রাজশাহী অধিনায়ক তাসকিন আহমেদের আশঙ্কাই যেন সত্যি হলো। কদিন আগে চেক বাউন্স নিয়ে ম্যাচ শেষে মজা করে তাসকিন বললেন, 'ওটা (চেক বাউন্স) হলে তো কিছু করার নেই। আশা করি হবে না, উইকেটের মতো বাউন্স করবে না।'
বিপিএলের শুরু থেকেই তুমুল আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে রাজশাহী। চট্টগ্রাম পর্বে পারিশ্রমিক বকেয়া থাকায় অনুশীলন বয়কট করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদরা। পরে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের হস্তক্ষেপে ২৫ শতাংশ সম্মানীর টাকা ক্রিকেটারদের বুঝিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ঢাকার ফিরতি পর্বের খেলা শুরুর আগে ক্রিকেটারদের দ্বিতীয় ধাপের পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা ছিল রাজশাহীর। সেটি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন ক্রিকেটাররা। এরই মধ্যে ম্যাচ বয়কট করেন বিদেশি ক্রিকেটাররা। বিপিএলের বাইলজ অনুযায়ী, দুজন বিদেশি ক্রিকেটার একাদশে রাখা বাধ্যতামূলক হলেও ‘বিসিবির বিশেষ ব্যবস্থায়’ শুধু দেশিদের নিয়েই রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল দুর্বার রাজশাহী। যদিও সেই ম্যাচটা বেশ নাটকীয় ভাবেই জিতে যায় রাজশাহী।
পেমেন্ট দেওয়া নিয়ে টালবাহানার মধ্যেই এবার ক্রিকেটারদের হোটেল ছাড়ার নির্দেশ নিয়ে আবারও আলোচনায় দুর্বার রাজশাহী। শোনা যাচ্ছে, প্রথমে ক্রিকেটারদের হোটেল ছেড়ে বাসায় চলে যেতে বলেছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকপক্ষ। কিন্তু তাতে তারা রাজি হয়নি। পরে, যাদের বাসা ঢাকায় তাদের হোটেল ছেড়ে যেতে বলা হয়। বাকিরা হোটেলে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাজশাহী জানিয়েছে, ‘কিছু ক্রিকেটারের অনুরোধের পরে, দুর্বার রাজশাহী ম্যানেজমেন্ট তাদের তিন দিনের বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুরোধটি মূলত ঢাকায় বসবাসকারী খেলোয়াড়রা করেছেন। তবে যারা ঢাকার বাইরে থাকেন, বিদেশি ক্রিকেটার এবং কোচিং স্টাফরা দলের সাথে ঢাকার টিম হোটেলে থাকবেন। ঢাকায় বাসা রয়েছে এমন খেলোয়াড়রা যে কোনো দিন টিম হোটেলে চেক ইন করতে পারবেন।’
প্রসঙ্গত, প্রথম রাউন্ডের সব ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে দুর্বার রাজশাহীর। ১২ ম্যাচে ৬ জয়ে ১২ পয়েন্ট নিয়ে তারা রয়েছে টেবিলের তিনে। তাদের সামনে প্লে-অফে ওঠার বেশ ভালো সম্ভাবনা থাকছে। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে আগামী শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি)। সেদিনই সবাইকে হোটেলে যোগ দিতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টাকা পরিশোধের সময় নিয়েছে রাজশাহী ম্যানেজমেন্ট।
আরও পড়ুন
রাজশাহী বিতর্কে কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছে চিটাগং কিংসের আমলনামা। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির হয়ে খেলা তরুণ বাংলাদেশি ব্যাটার পারভেজ হোসেন ইমন তার পারিশ্রমিক পাননি বলে শোনা যাচ্ছিল। এর মধ্যেই পারিশ্রমিক না দেওয়ার অভিযোগ তুললেন দলটির দুই বিদেশি ক্রিকেটার। চট্টলা ফ্র্যাঞ্চাইজির দুই বিদেশি ক্রিকেটার পাকিস্তানের খাজা নাফি ও আফগানিস্থানের জুবাইদ আকবরী এই অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি– কেবল পারিশ্রমিকই নয়, দেশের ফেরার জন্য বিমানের টিকিটও দিচ্ছে না চট্টগ্রাম। বিষয়টি স্বীকার করেছেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিক সামির কাদের চৌধুরী। একইসঙ্গে পারিশ্রমিকও শিগগিরই পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন।
পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার পাশাপাশি সন্দেহজনক পারফরম্যান্সের অভিযোগও রয়েছে এবারের আসরের বেশ কিছু ম্যাচে। ফিক্সিংয়ের বিষয়টি না হয় প্রমাণসাপেক্ষ, কিন্তু পারিশ্রমিক ইস্যুতেই বিপিএল বারবার খবরের শিরোনামে আসছে। যা নিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
দুঃখজনক বলছে বিসিবি
বিপিএলের শুরু থেকেই একের পর এক বিতর্ক উঠছে। যা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বিসিবির। অন্তত বিপিএলের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেকেই বলছে, ‘আগেই ভালো ছিল’। বিসিবির নতুন নেতৃত্ব এবার ভিন্ন রকম বিপিএল উপহার দেওয়ারই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিপিএল শুরুর আগে কোটি টাকা খরচ করে দেশ বিদেশের শিল্পীদের এনে কনসার্ট আয়োজন করা হয়। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটাররাই পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না।
পারিশ্রমিক বিতর্ক নিয়ে বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিম জানিয়েছেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এটা (চেক বাউন্স) আমার মাথায়ও আসেনি কিন্তু। দুই-একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি পারিশ্রমিক নিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি বা রাখতে পারেনি। তবে এর বাইরে বাকিরা কিন্তু প্রায় পুরো প্রতিশ্রুতিই রেখেছে। কিছুটা ব্যর্থ দুই-একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির কারণে ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কথা উঠে আসেনি।’
আইনি পথে হাঁটার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফাহিম বলেন, ‘আস্থা কিছুটা কম বলেই, এখন আমরা প্রতি মুহূর্তে তাদের নজরদারিতে রাখছি। প্রতিশ্রুতি যদি মোটামুটি রাখতেন তারা, তাহলে এত বেশি উদ্বিগ্ন হতে হতো না। তবে এখন থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে কি না, সেটি দেখব আমরা। কাগজপত্র প্রস্তুত আছে। সব লিগ্যাল পেপার করা আছে। সেখান থেকেই নির্দেশনা পাব আমাদের কী করতে হবে।’
এফআই