আরমানিটোলায় এবার নারী হকিও
শীতের সকালে মিষ্টি রোদ। এক দল নারী স্কুল শিক্ষার্থী হাতে স্টিক নিয়ে আরমানিটোলা স্কুলগামী। এরা কেউই আরমানিটোলা স্কুলের শিক্ষার্থী নন। বাংলাদেশের হকির সুতিকাগার আরমানিটোলা স্কুল শুধুই বালকদের বিদ্যাপীঠ। আহমেদ বাওয়ানী একাডেমী বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা আরমানিটোলা স্কুলে যান শুধু হকির জন্যই।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বুকে স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের হকি শেখার ঘটনা তেমন নেই। নতুন বছরে আহমেদ বাওয়ানী স্কুলই প্রথম শুরু করেছে। এই বিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠ না থাকায় পার্শ্ববর্তী আরমানিটোলা স্কুলের টার্ফেই হকি শিখছেন মেয়েরা। তাদের প্রশিক্ষক জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাকসুদ আলম হাবুল।
স্কুল মেয়েদের হকিতে আনার বিষয়ে হাবুল বলেন, ‘বাওয়ানী স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য আমার চাচাতো ভাই স্বপন। তিনিই মূলত হকির বিষয়টি জোর দিয়েছেন। ক্রীড়া শিক্ষকও হকির প্রতি আন্তরিক। যার ফলে এই উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়েছে।’ বাওয়ানী স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষিকা শেফালী নারীদের হকিতে আনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা খেলতে পছন্দ করে। তাই মেয়েদের আমরা হকিতে খেলার সুযোগ করে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত বেশ আগ্রহ নিয়েই শিখছে তারা। আশা করছি এই ধারবাহিকতা আমরা বজায় রাখতে পারব।’
বিজ্ঞাপন
হকি বেশ ব্যয়বহুল খেলা। বিশেষ করে স্টিকের দামই বেশি। মেয়েদের হাতে স্কুল কর্তৃপক্ষই স্টিক, বল তুলে দিয়েছে। আবার অনেক স্বচ্ছল পরিবার মেয়ের পছন্দ অনুযায়ী স্টিক কিনে দিয়ে শখ পূরণ করেছে।
বিজ্ঞাপন
২৫-৩০ জন নারী স্কুল শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন অনুশীলন করান হাবুল। তার এই হকি প্রশিক্ষণে রয়েছেন বাওয়ানী স্কুলের দুই শিক্ষিকার মেয়েও। এদেরই একজন দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী লাবণ্যের কণ্ঠে ঝরল হকিপ্রেম, ‘আমরা হকি খেলতে পেরে আনন্দিত। ফুটবল, ক্রিকেটের চেয়ে হকিই আমার বেশি ভালো লাগে। আমাদের স্কুলের মতো আশা করি অন্য স্কুলের মেয়েরাও হকি খেলতে আসবে।’
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবুলের চোখেও স্বপ্নের রেখা এই নারীদের নিয়ে, ‘কিছু দিন আগে বাংলাদেশ মহিলা ফুটবলে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। নারী হকি নিয়ে ফেডারেশন কিছুটা কাজ করছে। নান্নু ভাইও (সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া পরিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) নারী হকি পরিশ্রম করছে। আমি এই স্কুলের মেয়েদের নিয়ে কাজ করা শুরু করেছি। এই মেয়েদের মধ্যে অন্তত কয়েকজন জাতীয় পর্যায়ে খেলার মতো। এই মেয়েদের দেশে অন্য মেয়েরাও হকিতে এগিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশ নারী হকিতেও বিশেষ জায়গায় যাবে একদিন।’
বাংলাদেশের হকি ও আরমানিটোলা একে অন্যের পরিপূরক। স্বাধীনতার আগে থেকে আব্দুস সাদেক, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা থেকে শুরু করে কামাল, জিমির পরবর্তী প্রজন্মের আতুড়ঘরও এই আরমানিটোলা স্কুল। হকি অন্তঃপ্রাণ এই স্কুলে গত বছর ফাইভ-এ সাইড আকৃতির কৃত্রিম টার্ফ বসেছে। মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের পুরনো সবুজ টার্ফটি গত বছর আরমানিটোলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এই টার্ফে সকাল-বিকেল দু’বেলা অনুশীলন করান ফজলু ওস্তাদ। টার্ফ পাওয়ায় অনুশীলনও গতি এসেছে জানান জিমিদের গুরু, ‘টার্ফে বাচ্চারা বেশ আগ্রহ নিয়েই হকি শিখছে। এতে আরো বেশি পরিপক্ব হচ্ছে।’
আরমানিটোলা স্কুলের মাঠ হলেও এখানে অনুশীলন করেন অন্য স্কুলের শিক্ষার্থী-এলাকাবাসীও। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামাল বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন, ‘হকি টার্ফ ও মাঠটি স্কুলের নিজস্ব হলেও এখানে অন্যরা ব্যবহার করে। এতে সব সময় লোকারণ্য থাকে স্কুল প্রাঙ্গন। আমরা এতে বাধা দেইনি, উল্টো উৎসাই-ই দেই। আমার দৃষ্টিতে বাচ্চারা গলিতে সময় কাটানোর চেয়ে, মাঠে সময় কাটানো অনেক শ্রেয়।’
এজেড/এনইউ/এটি