অর্থনীতির শ্বেতপত্র ও অভিবাসন খাতের সংকট নিরসন

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা। ইতিমধ্যে ৫টি কমিশন তাদের যে প্রস্তাবনা প্রতিবেদন পেশ করেছেন, তা গঠনমূলক ও বাস্তবায়নযোগ্য। এছাড়া শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্তকরণ চলছে।
বিজ্ঞাপন
দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ এবং করণীয় নিয়ে আরও কিছু সুপারিশমালা রয়েছে ডিসেম্বর ২০২৪-এ পেশকৃত অর্থনীতির শ্বেতপত্রে। শেষোক্ত দুটিতে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন নিয়েও সুপারিশমালা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনকে সুষ্ঠু, ন্যায়সঙ্গত, সম্মানজনক করতে সরকারি, বেসরকারি খাতে যারা কাজ করছেন, তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই সুপারিশমালায় মতামত দিচ্ছেন।
অভিবাসন খাতে অনেকের সাথে আমিও সেই উদ্যোগে শামিল হয়েছি। ইতিমধ্যে সামগ্রিকভাবে কোন কোন দিকে কীভাবে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন খাতে সংস্কার আনা প্রয়োজন ও সম্ভব, তা নিয়ে লিখেছি। এবারে অর্থনীতির শ্বেতপত্রে শ্রম অভিবাসন সংস্কার নিয়ে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেই ব্যাপারে বিনীত মতামত পেশ করছি।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিস্থিতি: উন্নয়ন আখ্যান বিশ্লেষণ, এই শীর্ষক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদরা জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান ও অবদান অনস্বীকার্য। নিজস্ব বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীজনের সাথেও তারা মতবিনিময় করেছেন। অভিবাসন সংক্রান্ত একটি অনলাইন আলোচনায় আমি নিজেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলাম। ৩৮৫ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে ২৩টি বিভাগ আছে। শেষ বিভাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অচিরেই, মধ্যম পর্যায়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশলের দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শ্রম অভিবাসন স্থান পেয়েছে ১৭ চ্যাপ্টারে (২৮৪ থেকে ২৯৩ পৃষ্ঠায়)। প্রথমে আছে সংক্ষিপ্তভাবে সার্বিক পরিস্থিতি, তারপর ৭টি প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং শেষে চ্যালেঞ্জ নিয়ে সুপারিশমালা। এই অংশ প্রস্তুতের নেতৃত্বে যিনি ছিলেন, তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কাজেই তার এবং অন্যান্য বিভিন্ন মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনের এই অংশটি সুলিখিত এবং বাস্তবসম্মত নিঃসন্দেহে।
বিজ্ঞাপন
যে ৭টি চ্যালেঞ্জের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, শুরুতেই বলা হয়েছে এগুলো বিগত দশকে পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে আমার মতে আরও আগে থেকেই বেশকিছু চ্যালেঞ্জ ছিল, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান অর্থাৎ সমাধান করা হয়নি বা যায়নি। অধিকাংশ সময় অভিবাসীদের সম্মান ও অধিকারের কথা মুখে আর কাগজপত্রেই বেশি, সত্যিকার বাস্তবায়ন হয়নি।
অস্থিতিশীল শ্রম বাজার এবং স্বল্প দক্ষ শ্রম বাজার সম্পর্কে যেটি মনে করা দরকার যে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার গবেষণা কেন্দ্র নেই। এই ব্যাপারে সুপারিশ এসেছে বহুবার।
বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অভাবে সংকট ও সম্ভাবনার দূরত্ব বেড়েছে, কমেনি। এই ৭টি হচ্ছে—অধিক অভিবাসন ব্যয়, অস্বচ্ছ ভিসা সংগ্রহ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া, অনিরাপদ নারী অভিবাসন, ব্যাংক সুবিধা ও বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে কম অগ্রগতি, স্বল্প দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, অস্থিতিশীল শ্রম বাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
এই ৭টির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অন্যান্য সংকটগুলো বিদ্যমান, এ কথাও বলা যেতে পারে। আবার অস্বচ্ছ অভিবাসন প্রক্রিয়ার কারণে অভিবাসন ব্যয় বেশি, এ কথাও বলা যেতে পারে। অস্বচ্ছ অভিবাসন প্রক্রিয়ার বর্ণনায় প্রতিবেদনে মূলত মালয়েশিয়ার অভিবাসন খাতকেই সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
আসলে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াতেই নানা রকম অস্বচ্ছতা রয়েছে যার একটি বড় কারণ প্রতিবেদনে পরে আংশিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—ডিজিটাইজেশনে অস্বচ্ছতা। সেখানেও অবশ্য গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে একটি অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের অস্বচ্ছতার ব্যাপারে। আসলে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াকেই অনলাইনভিত্তিক করার মাধ্যমে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, নিরাপদ ও শক্তিশালী করার কথা ছিল। কোনো অজ্ঞাত কারণে তা এখনো হয়নি।
আরও পড়ুন
স্বচ্ছতার প্রশ্নে অভিবাসন সাব এজেন্টদের গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সাব এজেন্টদের দালাল আখ্যা দিয়ে অনেক অপবাদ দেওয়া হয়, অথচ বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যবস্থাপনা গ্রাম পর্যায়ে না থাকায় বিদেশ যেতে চাইলে এইসব এজেন্টরাই এখনো ভরসা। অন্যত্র একসময় লিখেছি। আরও অনেকে বলেছেন, এইসব সাব এজেন্টদের অভিবাসন শত্রু হিসেবে দূর দূর করে তাড়িয়ে না দিয়ে আরও অভিবাসনবান্ধব হতে সাহায্য করা উচিত।
প্রতিবেদনে নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি সংক্ষিপ্ত অংশ রয়েছে। যেটি বলা হয়নি তা হলো পুরো আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি জেন্ডার সংবেদনশীল হয়নি। নারী অভিবাসন ছাড়াও অন্য জেন্ডারের অভিবাসন অদৃশ্য ও নগণ্য হলেও বিদ্যমান আছে বলে অনেকে মনে করেন—এই বিষয়টি এখনো সামাজিক ট্যাবু।
আর নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে যা স্বীকার করা এবং পরিবর্তন করা দরকার তা হলো এখনো মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল প্রায় দাস প্রথার মতো সৌদি আরবে ধনবানদের বাসা বাড়িতে কাজ করার জন্য নারী অভিবাসন। নারী অভিবাসনের শ্রম বাজার সম্প্রসারণের জন্যও বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই, নারী অভিবাসীদের ক্ষমতায়নেরও কোনো প্রক্রিয়া নেই। নারী অভিবাসন নিয়ে ঢাকা পোস্ট-এই বিস্তারিত লিখেছি।
অস্থিতিশীল শ্রম বাজার এবং স্বল্প দক্ষ শ্রম বাজার সম্পর্কে যেটি মনে করা দরকার যে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার গবেষণা কেন্দ্র নেই। এই ব্যাপারে সুপারিশ এসেছে বহুবার। এমনকি অতীতের সরকারি পরিকল্পনাতেও আছে কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি।
বাজার অর্থনীতির সাথে আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিয়মিত গবেষণা ছাড়া চাহিদা অনুযায়ী অভিবাসীদের প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। একই সাথে মনে রাখা দরকার যে, শ্রম অভিবাসন কূটনীতিতেও বাংলাদেশ দুর্বল। এই ব্যাপারেও অতীতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির কথা ছিল কাগজে কলমে, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। যা হয়েছে তা হলো নতুন শ্রম বাজারের সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রবাস সফর, কিন্তু সেইসব দেশে শেষ পর্যন্ত শ্রম বাজার সম্প্রসারণ হয়নি।
অভিবাসন ব্যয় কমাতে হলে ফর্মাল চ্যানেলে টাকা প্রদান ও রেমিট্যান্স প্রেরণের সহজ, কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অনলাইন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করতে হবে।
শ্বেতপত্রে অভিবাসন খাতের আইন, নীতিমালার চ্যালেঞ্জ নিয়ে যথাযথ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হওয়া উচিত যে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থেকে সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা, বিধি ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পরিকল্পনা থাকার পরেও এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া।
শ্রম অভিবাসন সুশাসনের মনিটরিং-এর জন্য একটি জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি ও একটি জাতীয় শ্রম অভিবাসন ফোরাম গঠন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রায় নিষ্ক্রিয়। ফলে সুশাসনের জন্য জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা কার্যকর নেই। বরং নীতি নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যের চল বিদ্যমান, যে কথা শ্বেতপত্রে সঙ্গতভাবেই উল্লেখ আছে।
করণীয় সম্পর্কে শ্বেতপত্রে যেসব সুপারিশ আছে, তারমধ্যে কিছু কিছু আগেও সরকারি পরিকল্পনায় ছিল, যেমন অভিবাসন খাতে আলাদা ক্যাডার সার্ভিস চালু করা, বিএমইটিকে আলাদা বিভাগ হিসেবে উন্নীত করে তার অধীনে দপ্তর সৃষ্টি। কিছু কিছু নতুন ভালো প্রস্তাব আছে, যেমন কোন কোন দেশের দূতাবাসের জন্য শ্রম কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে, তার সুনির্দিষ্ট বিবেচ্য তালিকা করা, সংসদ সদস্য হিসেবে রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায় নিয়োজিত না থাকা, সংসদে অভিবাসন সংক্রান্ত পাবলিক হিয়ারিং/গণশুনানী, নারী অভিবাসনের ক্ষেত্র বিস্তৃত করা ইত্যাদি।
এছাড়াও আরও অনেক কিছু সরকারি পরিকল্পনাতে বা বিভিন্ন সুপারিশে আছে কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। কেন হয়নি এবং কীভাবে এসবের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, এই ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার ভাবতে পারে। যেসব দুর্নীতি অভিবাসন খাতে রয়েছে, সেগুলোর দেশে ও প্রবাসে সুষ্ঠু তদন্ত করে সে ক্ষেত্রেও জবাবদিহিতা সৃষ্টি করতে হবে।
দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিবাসন ব্যয় কমাতে হলে ফর্মাল চ্যানেলে টাকা প্রদান ও রেমিট্যান্স প্রেরণের সহজ, কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অনলাইন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করতে হবে। স্বল্পদক্ষ শ্রম অভিবাসনকে দক্ষ শ্রম অভিবাসনে পরিণত করতে যা যা করতে হয়, সব করতে হবে। শ্রম বাজার গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াকে অনলাইনভিত্তিক করতে হবে। এইসব প্রস্তাব তেমন নতুন নয়, অনেকেই একমত। কিন্তু কেন যেন বাস্তবায়ন হয় না। যতদিন না হয়, ততদিন ধরে বলে যেতে হবে হয়তো। সামনেই আসছে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, সেখানেও আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন নিয়ে কিছু বাস্তবমুখী সুপারিশ থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আরও আশা করছি এসব সুপারিশমালা ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হবে এবং অভিবাসন খাতে সুশাসন সুদৃঢ় হবে।
আসিফ মুনীর ।। অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ