বিজ্ঞাপন

চেমন আরার ১১ সন্তান, কেউ বিচারক, কেউ চিকিৎসক, কেউ উপাচার্য

চেমন আরার ১১ সন্তান, কেউ বিচারক, কেউ চিকিৎসক, কেউ উপাচার্য

একসময় ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে উঠত হারিকেন। সেই মিটমিটে আলোয় পাশাপাশি বসে পড়ত ১১ সন্তান। এক পাশে মাটির চুলায় রান্না হতো, অন্য পাশে চাটাইয়ে বসে বই-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকত সন্তানরা। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে তাদের পড়াশোনায় নজর রাখতেন মা। কে পড়ছে, কে ফাঁকি দিচ্ছে— কিছুই তার চোখ এড়াত না। অভাব ছিল, সংসারে টানাপোড়োন ছিল; কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে কোনো আপস করেননি তিনি। সেই মায়ের স্বপ্ন ও শাসনে বড় হয়ে ১১ সন্তানই আজ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কেউ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, কেউ চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা।

সন্তানদের এমন সাফল্যের নেপথ্যের কারিগর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত নাইখাইন গ্রামের গৃহবধূ চেমন আরা বেগম। বয়স এখন ৭৯ বছর। 

কে কোথায় রয়েছেন

চেমন আরার জ্যেষ্ঠ সন্তান মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক। দ্বিতীয় সন্তান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তৃতীয় সন্তান মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ। চতুর্থ সন্তান পারভীন আকতার দীর্ঘদিন ধরে নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। পঞ্চম সন্তান মোহাম্মদ আলমগীর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থায় (ওয়ারপো) প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার (পরিবেশ ও বন) হিসেবে কর্মরত।

ষষ্ঠ সন্তান সেলিনা আকতার বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। সপ্তম সন্তান ডা. মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রামের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। অষ্টম সন্তান অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ পটিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নবম সন্তান অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম চুয়েটের উপাচার্য। দশম সন্তান রেজিনা আকতার চট্টগ্রামের হোসাইন আহমদ সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক।

সবচেয়ে ছোট সন্তান ডা. মোহাম্মদ ওমর কাইয়ুম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এ সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার অ্যান্ড রেসিডেন্ট অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। অর্থাৎ আট ছেলে ও তিন মেয়ের সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

১১ সন্তানের মধ্যে সম্প্রতি বড় অর্জন এসেছে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের হাত ধরে। ২৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অধ্যাপক সায়েম চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। এর আগে তিনি পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, গ্রিন হাইড্রোজেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্যও তিনি পরিচিত।

চুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ২০০৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। পরে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১১ সন্তানের সাফল্যের কারিগর মা

চেমন আরার স্বামী মো. আবদুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির কর সংগ্রাহক। পরে তিনি উপ-কর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সীমিত আয়ের সংসারে ১১ সন্তানকে মানুষ করা সহজ ছিল না। কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে কখনো পিছপা হননি চেমন আরা। আট ছেলে ও তিন মেয়ের সবাই উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পেছনে মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন সন্তানরা। সংসারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে নিজের কষ্ট ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন তিনি।

চেমন আরার অষ্টম সন্তান ও পটিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মায়ের। সংসারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি কখনো আমাদের পড়াশোনায় ছেদ পড়তে দেননি। নিজের কষ্ট, অভাব-অনটন কিংবা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে তিনি সবসময় আমাদের শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।

তিনি বলেন, মা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই বিশ্বাস থেকেই আমাদের প্রত্যেককে সততা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের শিক্ষা দিয়েছেন। আজ আমরা যে যার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি, তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন আমাদের মা।

কনিষ্ঠ সন্তান, আইইডিসিআরের রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ওমর কাইয়ুম বলেন, আম্মা ছিলেন একাধারে রাগী, আবার আদর-স্নেহ, মায়া-মমতায় ভরা। এখনো মনে পড়ে, বাড়ির রান্নাঘরের এক পাশে মাটির চুলায় রান্না চলছে, অন্যদিকে চাটাইয়ে বসে তিনি আমাদের সবার পড়াশোনার তদারকি করছেন। কে কী করছি, কে পড়ছি না— সবকিছুই ছিল তার নখদর্পণে। ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।

তিনি বলেন, আম্মা মাঝে মাঝে প্রচণ্ড অসুস্থ থাকতেন। কিন্তু সেই সময়েও আমাদের মক্তব ও স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতেন এবং পড়াশোনার সবকিছু নিয়মিতভাবে ফলোআপ করতেন।

বাবার শাসনও ছিল কঠোর। ডা. ওমর কাইয়ুম বলেন, আব্বা ছিলেন অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আপাদমস্তক সৎ, নির্মোহ ও নৈতিকতাবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। আমরা তাকে প্রচণ্ড ভয় পেতাম, যদি ঠিকমতো পড়াশোনা না করতাম কিংবা পরীক্ষার ফল ভালো না হতো। কারণ বাসায় ফিরে পরীক্ষার সব উত্তর আবার আব্বাকে জানাতে হতো। কোনো কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে আব্বার কাছে যেতে খুব ভয় পেতাম। তখন আব্বা বলতেন, তোমার আম্মার কাছ থেকে প্রগতি পত্রে স্বাক্ষর করে নিও।

ডা. ওমর কাইয়ুম বলেন, আমরা যারা ছোট, তারা আসলে বড়দের দেখেই বেড়ে উঠেছি। এখনো যেকোনো বিষয়ে তাদের কাছ থেকে শেখা নীতি-নৈতিকতা ও সততাকে সর্বদা প্রাধান্য দিই। আব্বা-আম্মা ও বড় ভাই-বোনদের একটাই লক্ষ্য ছিল— আমরা যেন সত্যিকারের মানুষ হতে পারি, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করতে পারি। তাদের সেই শিক্ষাই আমাদের পথ দেখিয়েছে। আমরা এখনো সেই লক্ষ্যেই নিজেদের সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি।

স্থানীয়রা জানান, শুরুতে একদিকে সীমিত আয়, অন্যদিকে ১১ সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয়— সব মিলিয়ে চেমন আরার জীবন ছিল নিরন্তর সংগ্রামের। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাকে কখনো সন্তানদের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি তিনি। সন্তানদের মধ্যে বড়রা যখন পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে শুরু করেন, তখন ছোটদের পড়াশোনার পথও ধীরে ধীরে সহজ হতে থাকে। একে একে পরিবারের প্রতিটি সন্তান উচ্চশিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন।

স্বীকৃতিও পেয়েছেন চেমন আরা

জীবনভর সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রামের স্বীকৃতিও পেয়েছেন চেমন আরা বেগম। ২০২৪ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভাগীয় পর্যায়ে ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। একই বছর জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত হন শ্রেষ্ঠ জয়িতা। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে ‘রত্নগর্ভা মা’ ও জাতীয় পর্যায়ের রত্নগর্ভা সম্মাননাসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

এমআর/আরএফ