রিকশার প্যাডেল আর বাদামের ঠোঙায় বাঁধা আনন্দ

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যখন মানুষ ঈদের আনন্দে ঘর ছেড়ে বেরোচ্ছে, তখনই কিছু মানুষ জীবন সংগ্রামে রাস্তায় নেমেছে। তাদের কাছে ঈদ মানে নতুন কাপড় নয়, ভালো খাবার নয়—বরং কিছু বাড়তি টাকা, যা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। ঈদের দিনও এসব শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিনের মতো কাজে বের হয়েছেন। তারা কাজের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ খুঁজে নিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের প্রতিটি দিনই তাদের কাজ করে যেতে হয় যদি সুস্থ থাকেন। টাকা উপার্জন করতে না পারলে সংসার চালানো তাদের জন্য অনেক কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসবে তারা রাস্তায় বের হন একটু বাড়তি আয়ের জন্য। এভাবে চলে তাদের জীবন।
সোমবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর বাড্ডা ও গুলশান গুদারাঘাট এলাকায় শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
বিজ্ঞাপন
রিকশা চালক রুবেল মিয়া (৩৮) থাকেন ঢাকার উত্তর বাড্ডায়। বাড়ি ময়মনসিংহে হলেও ঈদের দিন তিনি পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাননি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে তিনি যা আয় করেন, তা দিয়েই তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের সংসার চলে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
রুবেল বলেন, বাড়ি যেতে মন চায়, কিন্তু টাকা না থাকলে তো সংসার চলবে না। ছেলে-মেয়ের মুখে হাসি দেখার জন্যই রাস্তায় নামতে হয়েছে।
এদিকে গুলশান গুদারাঘাট এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক হাসান শেখের (৪৫) সঙ্গে। তিনি থাকেন ভাটারা এলাকায়। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায়। ঈদের দিনও তিনি রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছেন। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তার গলা ভারী হয়ে আসে।
তিনি বলেন, মহল্লার সবাই ঈদ করছে, আমি গরিব মানুষ, তাই দুই টাকা উপার্জনের জন্য রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। এবার খুব বেশি টাকা আয় হয়নি বলেই ঈদে বাড়ি যাইনি। ঈদের দিনও বের হয়েছি রিকশা নিয়ে, কিছু টাকা যদি উপার্জন করা যায়। কারণ ঈদের দিন মানুষ ঘুরতে বের হয়, তখন একটু বাড়তি ভাড়া পাওয়া যায়। তবে বউ-বাচ্চা বায়না ধরেছে ঈদের দিন ঘুরতে যাবে। তাই বউ-বাচ্চাকে বলে এসেছি কয়েকটা ক্ষ্যাপ মেরে কিছু টাকা নিয়ে বাসায় যাব, তারপর একসঙ্গে সন্ধ্যার দিকে কোথাও ঘুরতে যাব।
এদিকে দুপুরের দিকে গুলশান গুদারাঘাট এলাকায় বুট-বাদামের গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন কামাল হোসেন (৫০)। ঈদের দিনও ঠোঙ্গায় করে বুট-বাদাম বিক্রি করছেন। রাস্তায় বের হয়েছেন এই আশায় যে ঈদের দিন মানুষ আনন্দ করার জন্য বাইরে বের হবে পরিবার নিয়ে, তখন যদি একটু বাড়তি বিক্রি করা যায়।
তিনি বলেন, প্রতিদিন যদি বেচাকেনা না করতে পারি, তাহলে বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারবো না এবং নিজেও ঢাকা শহরে থাকতে পারবো না। এবার গত এক-দুই মাস ব্যবসা তেমন ভালো হয়নি, সেজন্য বাড়িতে যেতে পারিনি। আমার মেয়েটা বারবার ফোন দিয়ে বলেছে, "আব্বা, তুমি বাড়িতে আসবে না?" তখন মেয়েকে একটা নতুন জামা কেনার টাকা দিয়ে বলছি, "মা, এই বাড়িতে আসতে পারবো না, আগামী ঈদে আসবো।" আমাদের তো একদিনও বসে থাকার সুযোগ নেই। তাই ঈদের দিন হোক আর অন্য যেকোনো দিন হোক, সব দিনই আমাদের কাজ করে যেতে হয়। তবে এই মানুষজন ঘুরতে বেরিয়েছে, এগুলো দেখলে ভালো লাগে, ঈদ ঈদ মনে হয়। তবে বাড়িতে যদি যেতে পারতাম, তাহলে অনেক ভালো লাগতো।
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে মিলন। কিন্তু রুবেল, হাসান আর কামালের মতো হাজারো মানুষকে ঈদের দিনও জীবন সংগ্রামে রাস্তায় কাটাতে হয়। তাদের স্বপ্ন একটাই—একদিন যেন তাদের পরিবারের মুখে সত্যিকারের ঈদের হাসি ফোটে।
এমএসি/এআইএস