অনশন-অবরোধের আট ঘণ্টায় ভোগান্তি সীমাহীন

সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস, তারমধ্যে আজ বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের তোড়জোড় শুরু এরমধ্যে সকালে মহাখালী ব্যস্ততম সড়কের দুই লেন অনশনে আটকে রেখেছে সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। আট ঘণ্টা পার হলেও সড়ক না ছাড়ায় নাকাল দশা রাজধানীর উত্তর সিটি এলাকা।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার(৩০) দুপুরে গুলশান-মহাখালী সড়ক আটকে বিক্ষোভে অংশ নেন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরসহ সাত দাবিতে পাঁচ শিক্ষার্থীর অনশনে শুরু সড়ক অবরোধ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের অবরোধের ফলে বিশ্ব ইজতেমার আগের দিন মহাখালী ও আশেপাশের এলাকাজুড়ে ভয়াবহ যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী, পথচারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগবাজার থেকে গুলশান-বনানী সড়ক একেবারেই থমকে থাকতে দেখা যায়। এ অবস্থায় বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা দেন অনেকে। তবে ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। ব্যাগপত্র, মালামাল নিয়ে কারো অপেক্ষা বাসের জন্য কারো অপেক্ষা যানবাহন পাওয়ার, কেউ বা বাসেই অপেক্ষা করেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ইজতেমাগামী ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব বাস যাত্রী নজরুল ইসলাম ভোগান্তি নিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে ওঠে নাই, গাড়ি নড়ে না, হাসপাতালগামী রোগী যদি মরেও যায় তবুও কিছুই করার নেই।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, সেই আছরের নামাজ পড়ে বাসে উঠছি। প্রায় ৩ ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে তেজগাঁও পার হতে পারিনি। খবর নিচ্ছি, শুনতেছি সড়কের যাচ্ছে-তাই অবস্থা। যেদিকে চাই শুধু গাড়ি আর গাড়ি আটক হয়ে পড়ে আছে সড়কে। ফুটপাতে হাঁটা মানুষও বেশি। এরমধ্যে আজ ইজতেমা ময়দানের বাড়তি গাড়ী-যাত্রীও ঢুকছে ঢাকায়। সবমিলে ভোগান্তির শেষ নেই।
আরিফুল ইসলাম নামে গুলশান-১ থেকে আলিফ বাসের এক যাত্রী বলেন, সেই সকালের ধর্মঘট। দুপুরে ভুগতে ভুগতে গেছি গুলশান। ফিরতি পথে বাসে ওঠার অবস্থা নাই। হেঁটে গুলশান থেকে মহাখালী আসতে হয়েছে। এমন অবস্থা সব মানুষেরই। এভাবে ধর্মঘট হবে, প্রশাসন নিশ্চুপ, আমাদের অবস্থাটা কেউ ভাবে না। এভাবেই যদি দিনব্যাপী রাস্তা বন্ধ রাখা হয় তাহলে আগে জানায় দিলেও মানুষ অন্তত ভোগান্তি থেকে বেচে যায়।
বৈশাখী পরিবহনের বাসের চালক পারভেজ মিয়া বলেন, আজ পুরো দিনডাই লস। এইডা আগে জানলে বাস নিয়া বাইরাতাম না। জমা টাকা উসুল তো দূরের কথা, খাওন-খরচার টাকাও উঠাতে পারুম না। বাস তো আর বাড্ডা থেকে সাভারের উদ্দেশ্যে ফেরাতেই পারতেছি না। গুলশান-১ আইসা আইটকা আছি।
জহুরুল ইসলাম নামে মহাখালীর একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আজ স্ত্রীসহ তেজগাঁও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খালা শাশুড়িকে দেখতে যাবার কথা। বাড্ডা থেকে স্ত্রী রাতের খাবার রান্না করে নিয়ে আসবে। আমি অফিস শেষ অপেক্ষায় আছি। কিন্তু স্ত্রী জানালো কোনো যানবাহন আসতে চাইছে না। সড়কে যান চলাচলই নাকি বন্ধ। আমিও সকালে অফিসে ঢুকছি, নিচে যে এমন অবস্থা ভাবিনি। অফিসের নিচে নেমে দেখি রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। অগত্যা সব পরিকল্পনা বাদ। ভাবছি সড়কে থাকা রোগীদের কি করুন অবস্থা!
ট্রাফিক গুলশান বিভাগের কর্মকর্তাদের মুখে অসহায়ত্বের ছাপ। কথোপকথনে সমর্পণ কেউ কেউ বলছেন, আমরাই এখন ক্লান্ত, আর কতো। কারণ, সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবারে সরকারি তিতুমীর কলেজ শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে রাজধানীর গুলশান-বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেইট ও মগবাজার এলাকায় তৈরি হয়েছে ভয়াবহ যানজট। যেটা সামাল দিতে দিতে ট্রাফিক সদস্যদের অবস্থা কাহিল সেই দুপুর থেকেই।
গুলশান ট্রাফিক বিভাগের মহাখালী জোনের সহকারী কমিশনার মো. জুনায়েদ জাহেদী ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মহাখালী সড়কে অবস্থান কর্মসূচির কারণে সকাল থেকে সড়কে চাপ বেড়েছে। দুপুরের পর সেই চাপ ভোগান্তিতে পরিণত হয়। বিকেল থেকে ঘরমুখো যানবাহন-যাত্রীর চাপ সড়কে। এরমধ্যে দূরপাল্লার বাস, ইজতেমার বাসের চাপ। সবমিলে বেসামাল অবস্থা। গুলশান-মহাখালীতে আর যানজট সীমিত নয়, এটা তেজগাঁও, বনানী, বাড্ডা, ছাড়িয়ে গেছে। চাপ কমানোর কোনো ডাইভারশন আর কাজে দিচ্ছে না।
ট্রাফিক গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জিয়াউর রহমান বলেন, উত্তরা থেকে আসা যানবাহনগুলো ফ্লাইওভার দিয়ে পাস করার চেষ্টা করছি। বিপরীত দিকের গাড়িগুলোকেও বনানীর দিকে পাঠিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। বিকেলের পর কোনো কিছুই আর স্বাভাবিক নাই। কোনো টোটকাই আর কাজ করছে না। এখন চেষ্টা যত সম্ভব ধীর গতি হলেও সোজা সড়ক সচল রাখার।
ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার(ডিসি) মফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ক্রাইম ডিভিশনকে বার বার অনুরোধ করা হচ্ছে কিছু একটা করুন। মানুষের ভোগান্তি সীমাহীন হয়ে গেছে। যা হয়েছে তা ক্লিয়ার করতে রাত শেষ হয়ে যাবে। দূরদূরান্ত থেকে ইজতেমার মানুষগুলো কি নিদারুণ কষ্টে পড়েছে। ডাইভারসনগুলো বিকেল পর্যন্ত বেশ কাজে দিয়েছে। অফিস ছুটির পর সব বেসামাল। কারণ, মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা এখনও আটকে আছে সড়ক।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন রায়হান বলেন, তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরসহ সাত দাবিতে পাঁচ শিক্ষার্থীর অনশন চলছে। মাঝে অবরোধ তুলে নেওয়ার আলোচনাও হয়েছে ভোগান্তি বিবেচনায়। কিন্তু ক্যাম্পাস শাটডাউন থাকার পরও অধ্যক্ষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। অনশনরতরা অসুস্থ হওয়ার পরও দেখতে আসেননি। সে কারণে ক্ষেপে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী স্ব প্রণোদিত হয়ে রাস্তায় বসে পড়েছে।
এ নিয়ে গুলশান বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রিয়াজুল হক বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটা প্রতিধি দল এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি রাস্তা যত দ্রুত সম্ভব ক্লিয়ার করা যায়।
জেইউ/এআইএস