প্রদাহ ও জয়েন্টের ব্যথা দূর করতে কারকিউমিন কতটা কার্যকর?
বর্তমানে তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধ অসংখ্য মানুষ ভুগছেন জয়েন্টের ব্যথায়। একটাসময় বৃদ্ধরা এমন হাড়জনিত সমস্যায় ভুগলেও এখনকার চিত্রপট আলাদা। আর তাই এখন কম বয়স থেকেই সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় এমন সব খাবার রাখা উচিত যা প্রদাহ ও জয়েন্টের ব্যথা উপশম করে।
জয়েন্টের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই খাদ্যতালিকায় হলুদ রাখেন। বলা হয় এই মসলায় থাকা কারকিউমিন শরীরের বিভিন্ন প্রদাহ দূর করতে এবং জয়েন্টের ব্যথা কমাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আসলেই কি তাই? কারকিউমিন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানুন এই প্রতিবেদনে-
কারকিউমিন কী?
কারকিউমিন হলো হলুদের একটি সক্রিয় উপাদান। হলুদের যে হলুদ রঙ তা এই কারকিউমিনের জন্যই। এই পদার্থটি প্রসাধনী, পিগমেন্টেশন, খাবার থেকে শুরু করে কিছু ক্লিনিক্যাল চিকিৎসার জন্যও ব্যবহার হয়।
বইয়ের ভাষায় বলা যায় কারকিউমিন একটি পলিফেনল যা ‘কারকুমা লংগা’ উদ্ভিদের রাইজোমে মেলে। সাধারণত একে আমরা হলুদ নামে চিনি। কারকিউমিনের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টি ক্যানসার বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
কারকিউমিনের উপকারিতা
কারকিউমিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা কোষকে ফ্রি র্যাডিকেল দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এটি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করে এবং টিউমারের বিস্তার রোধ করে ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। বিশেষত স্তন ক্যানসার, কোলন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে কারকিউমিন। এর অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এটি আইবিএস ও আইবিডি’র মতো প্রদাহজনিত পেটের রোগ থেকেও মুক্তি দেয়।
কারকিউমিনের অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যগুলো অ্যালঝাইমার রোগের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ অবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এটি মস্তিষ্ক থেকে প্রাপ্ত নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (বিডিএনএফ) বৃদ্ধি করে।
কারকিউমিন কি প্রদাহ কমায়?
প্রদাহ হলো সংক্রমণ বা আঘাতের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া যা আঘাত, সংক্রমণ বা অসুস্থতা প্রকাশ করে। এটি একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীরের ইমিউন সিস্টেম, রক্তনালী এবং বিভিন্ন কোষ টিস্যুর ক্ষয়কে প্রকাশ করে।
যখন শরীর আহত হয়, সংক্রমিত হয় কিংবা ক্ষতিকারক পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তখন ইমিউন সিস্টেম শ্বেত রক্তকণিকা এবং অন্যান্য কেমিক্যাল বার্তাবাহককে প্রভাবিত এলাকায় প্রেরণ করে। এরপর এই পদার্থগুলো প্রদাহ তৈরি করার মাধ্যমে জায়গাটিকে শনাক্ত করে। ফলে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই সমস্যার বিপক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারকিউমিন কি দেহের প্রদাহ কমাতে পারে? হ্যাঁ। অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কারকিউমিন দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এটি নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর-কাপ্পা বি (NF-κB) এবং সাইটোকাইনের মতো অণুর কার্যকলাপ হ্রাস করে। যা প্রদাহ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঝুঁকি কমায়।
কারকিউমিন কি জয়েন্টের ব্যথা উপশম করে?
জয়েন্টের ব্যথা বলতে দেহের বিভিন্ন জয়েন্টে প্রদাহ বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথাকে বোঝানো হয়। জয়েন্টে ব্যথার কারণ হতে পারে আর্থ্রাইটিস, আঘাত, সংক্রমণ, অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম, ব্যবহারের অভাব, মচকে যাওয়া ইত্যাদি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জয়েন্টে ব্যথার কারণ হয় বাত। এতে জয়েন্টগুলোতে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং এগুলো ফুলে যায়।
কারকিউমিন জয়েন্টের ব্যথা এবং জয়েন্টের শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে অস্টিওআর্থ্রাইটিসে এবং রিমিটয়েড আর্থ্রাইটিসে উপশমে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সবমিলিয়ে বলা যায় প্রদাহ কমাতে এবং জয়েন্টের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে খাদ্যতালিকায় কারকিউমিন সমৃদ্ধ উপাদান হলুদ রাখতে পারেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে কালো গোলমরিচে থাকা পিপারিনের সঙ্গে মেশালে শরীরে কারকিউমিন শোষণের হার ২০০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।