দুর্নীতি, প্রতারণা, অবৈধ বল প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুট ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক জোগসাজশে ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের মামলার আসামি করা হয় সদ্য দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনকে। তার সঙ্গে আরও আসামি রয়েছেন ১৯ জন।
ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজের আদালতে মামলার আবেদন করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি আমলে গ্রহণ করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) মামলার বাদী আবদুচ ছামাদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার তদন্ত চলছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ছিল। তবে ওইদিন তদন্ত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি ৷ এ কারণে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর আগামী ১১ অগাস্ট প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন রেখেছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন।
মামলার অপর আসামিরা হলেন, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, আরাস্ত খান, প্রফেসর মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, প্রফেসর ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, প্রফেসর ডা. কাজী শহীদুল আলম, মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী এবং প্রফেসর ডা. মো. সিরাজুল করিম।
মামলার এজাহারে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন নামে। তাকে এজাহারের ১২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এস আলম ও আবদুল ওয়াহেদের দ্বারা যোগসাজশে নির্বাচিত পরিচালক।
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনই মামলার আসামি কি না সেই পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। আদালতের কর্মকর্তা, এমনকি আইনজীবীও নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেননি তিনি সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। তবে মামলার বাদী আবদুচ ছামাদ জানিয়েছেন তিনিই সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী পক্ষের আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি সাহাবুদ্দিন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি কি না আমার জানা নেই। আমি ব্যাংকের পক্ষে প্যানেল আইনজীবী হিসেবে মামলা ফাইলিং করেছি। এর বাইরে আমার কিছুই জানা নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে লিস্ট দিয়েছে তা ধরে মামলা ফাইলিং করা হয়েছে।’
মামলার বাদী আবদুচ ছামাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা দেখে বলতে হবে। পরে বলে উনিই (সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি) হওয়ার কথা। এটায় মনে হচ্ছে। কারণ মামলার ঘটনা যখন বলা হচ্ছে ওই সময় তিনি ব্যাংকের দায়িত্বে ছিলেন।’
মামলার অভিযোগ বলা হয়, আসামিদের পরিচালিত ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করেন। যা প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ। এসব শেয়ারের মোট মূল্য ২৫১ কোটি টাকা।
ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা হলেও পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৮ লাখ টাকা। মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে, পরস্পরের যোগসাজশে ও একই অভিপ্রসভঙ্গের মাধ্যমে জনগণের অর্থে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এ লেনদেন সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মোট ৮১ দশমকি ৯২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করেছে ২৪টি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি, যাদের অনেকেই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই শেয়ার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের তারিখ সংক্রান্ত তথ্যসমূহ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, শেয়ার বিক্রি ও ক্রয়ের তারিখ উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই একই দিনেই হয়েছে, অর্থাৎ শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি পূর্ব-পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
এস আলম গ্রুপ, তার মালিক/উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি এবং তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে এই ব্যাংকের ওপর দখল প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং তার দায়-দায়িত্বও সম্মিলিতভাবেই তাদের ওপর বর্তায়। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অবৈধভাবে নিজেরা লাভবান হয়ে জনগণের অর্থের তসরূপে একই অভিপ্রায়ে ফৌজদারী বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
মামলা দায়েরের পর মো. সাহাবুদ্দিন বাদে অপর আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত।
এনআর/এসএম
