মহুয়া মৈত্রকে বহিষ্কারের ঘটনায় ভারতকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার

ভারতের বিরোধী দলীয় সুপরিচিত এমপি মহুয়া মৈত্রকে যেভাবে সে দেশের পার্লামেন্ট ২০২৩ সালে বহিষ্কার করেছিল, তার কড়া সমালোচনা করেছে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন বা আইপিইউ। সংস্থাটি তাদের রিপোর্টে সোজাসুজি বলেছে, এই বহিষ্কারের “কোনও আইনি ভিত্তিই ছিল না!”
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টের সম্মিলিত ফোরাম হলো এই আইপিইউ, পৃথিবীর মোট ১৮১টি দেশ এর সদস্য। সুইটজাল্যান্ডের জেনেভায় এ সংস্থার সদর দপ্তর।
মহুয়া মৈত্র ২০১৯ সাল থেকে ভারতের তৃণমূল কংগ্রেসের একজন এমপি, এবং শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথিত আঁতাত বা ‘নেক্সাসে’র বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পার্লামেন্টে ও পার্লামেন্টের বাইরে সরব।
বিজ্ঞাপন
এমপি হিসেবে তার প্রথম টার্ম শেষ হওয়ার যখন মাত্র মাসকয়েক বাকি, তখন “টাকার বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন তোলার” একটি অভিযোগে পার্লামেন্টারি এথিকস কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মহুয়া মৈত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এখন সেই ঘটনাটি খতিয়ে দেখার পর আইপিইউ বলেছে, ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল একটি “বিতর্কিত” রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং (এথিকস কমিটিতে) কোনও “ঐকমত্য ছাড়াই” সেটি গৃহীত হয়েছিল।
“সবচেয়ে বড় কথা, অভিযোগটা যাকে নিয়ে সেই মহুয়া মৈত্রকে সভায় আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি”, মন্তব্য করেছে তারা।
বিজ্ঞাপন
ভারতের জন্য এই সমালোচনা খুবই অস্বস্তিকর, কারণ ভারত আইপিইউ-এর খুব পুরোনো ও প্রভাবশালী সদস্য – এবং নিজ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও পরম্পরা নিয়ে ভারত বরাবরই গর্ব করে থাকে। সেখানে একজন সুপরিচিত বিরোধী এমপির কণ্ঠস্বর অন্যায়ভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, আইপিইউ-এর এই পর্যবেক্ষণ ভারত সরকার বা ভারতের পার্লামেন্টের জন্য অবশ্যই বিব্রতকর।
তবে এই রিপোর্ট সামনে আসার পর ভারতে পার্লামেন্টের স্পিকার বা ভারতের সংসদীয় মন্ত্রী – কারও পক্ষ থেকেই এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। আর মহুয়া মৈত্র নিজে বলেছেন, “একজন পার্লামেন্টারিয়ানের মৌলিক অধিকার এভাবে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিল ভারতে প্রথম আর নজিরবিহীন। আমি আনন্দিত যে আইপিইউ সেটারই স্বীকৃতি দিয়েছে।”
যেভাবে ঘটেছিল বহিষ্কার
২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর আসন থেকে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে জিতে প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন মহুয়া মৈত্র, যিনি রাজনীতিতে আসার আগে ছিলেন একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার।
এমপি হিসেবে লোকসভায় তার প্রথম ভাষণেই তিনি বর্ণনা করেন ফ্যাসিবাদের সাতটি “সিগনেচার লক্ষণ” কীভাবে নরেন্দ্র মোদির শাসনকালের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। আর সেই ভাষণই দেশে ও দেশের বাইরে তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
পরে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত শিল্পপতি গৌতম আদানি ও তার শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে শুরু করেন। বস্তুত পার্লামেন্টে তিনি ছিলেন বিজেপি সরকারের কঠোরতম সমালোচকদের একজন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ঝাড়খন্ডের বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ আনেন, আদানি শিল্পগোষ্ঠীকে নিশানা করে মহুয়া মৈত্র সংসদে এমন বহু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন – যেগুলোর বিনিময়ে তিনি আদানির প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পপতি দর্শন হীরানন্দানির কাছ থেকে “উপহার ও অর্থ” উৎকোচ হিসেবে নিয়েছেন।
এমনকি এমপি হিসেবে তার লগইন ডিটেল ও পাসওয়ার্ডও তিনি দুবাইতে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে নিশিকান্ত দুবের আনা এই অভিযোগ পরিচিতি পায় “ক্যাশ ফর কোয়ারি” নামে। যদিও অভিযুক্ত তৃণমূল এমপি বরাবরই দাবি করে এসেছেন তিনি কোনও “ক্যাশ” বা নগদ অর্থর লেনদেন কখনোই করেননি।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে লোকসভার এথিকস বা নৈতিকতা বিষয়ক কমিটি তাকে শুনানির জন্য ডাকে। পরে উপস্থিত একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, দুবাইতে তিনি কোন হোটেলে কার সঙ্গে ছিলেন এই জাতীয় প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছিল মহুয়া মৈত্রকে।
এই ধরনের অপমানজনক প্রশ্ন ও হেনস্থার প্রতিবাদে মহুয়া মৈত্র শুনানি থেকে বেরিয়ে আসেন। কমিটির বিরোধী দলীয় সদস্যরাও অনেকেই তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে সভা বয়কট করেন। বিজেপির তদানীন্তন এমপি বিজয় সোনকারের নেতৃত্বাধীন এথিকস কমিটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত মিস মৈত্রর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারই সুপারিশ করে, এবং কমিটির ভেতরে ছয়-চার ভোটাভুটিতে সেই সুপারিশ গৃহীত হয়।
এথিকস কমিটি জানায়, তারা মনে করে হীরানন্দানি গোষ্ঠীর কাছ থেকে নানা ধরনের উৎকোচ ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে মিস মৈত্র তাদের স্বার্থকে সুরক্ষিত করতে পার্লামেন্টে একের পর এক প্রশ্ন করেছেন। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ২০২৩ সালের আটই ডিসেম্বর পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভা থেকে মহুয়া মৈত্রকে বহিষ্কার করা হয়।
তাকে দিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবন ও এমপি হিসেবে প্রাপ্য সব সুযোগসুবিধাও ছাড়তে হয়। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এথিকস কমিটির রিপোর্ট নিয়ে সভায় আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছিলেন মাত্র ৩০ মিনিট। তবে, শেষ পর্যন্ত সেটুকু সময়ও আলোচনা হয়নি, মহুয়া মৈত্রও পার্লামেন্টে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাননি।
সেই ঘটনার মাত্র তিন-চার মাস পরেই ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে মহুয়া মৈত্রকে তার পুরনো কৃষ্ণনগর আসন থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস মনোনয়ন দেয় এবং সেখানে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি আবার দেশের পার্লামেন্টে ফিরে আসেন।
আইপিইউ এখন যা বলছে
গত ৩ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয় আইপিইউ-এর ১৭৬তম অধিবেশন। সেখানে ওই সংস্থার “পার্লামেন্টারিয়ানদের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি” মহুয়া মৈত্রর এই ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও আলোচনা করেছে।
সেই আলোচনার পর কমিটির পক্ষ থেকে যে রিপোর্টটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে, তার ছত্রে ছত্রে রয়েছে ওই বহিষ্কারের পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা। আইপিইউ বলেছে, যেভাবে একটি বিতির্কিত রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং অভিযুক্তকে নিজের বক্তব্য পেশ করার অধিকার না দিয়েই এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে তারা উদ্বিগ্ন বোধ করছে।
আরও পড়ুন
তাছাড়া এথিকস কমিটির চেয়ারম্যান তথা বিজেপি এমপি বিজয় সোনকারের বিরুদ্ধে “বৈষম্যমূলক” ও “হানিকর” (প্রেজুডিসিয়াল) আচরণের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটাও খুবই বিচলিত করার মতো বলে আইপিইউ মনে করছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে গুরুতর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার জন্যই মহুয়া মৈত্রকে শাস্তি পেতে হয়েছে, এই ধরনের অভিযোগ যে উঠছে সেটাতেও আইপিইউ উদ্বিগ্ন বোধ করছে।
প্রসঙ্গত, পার্লামেন্ট থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর মহুয়া মৈত্র বলেছিলেন, সরকার আর আদানি গোষ্ঠীর মধ্যে আঁতাত নিয়ে তার প্রশ্ন তোলার “ঔদ্ধত্য”টাই আসলে এথিকস কমিটি সহ্য করতে পারেনি।
আইপিইউ আরও বলেছে, “এই ধরনের পটভূমিতে এরকম একটা ‘ডিসপ্রোপোরশনেট’ শাস্তি বিরোধীদের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেবে বলেই ধারণা করা যায়!”
বিভিন্ন দেশের জাতীয় পার্লামেন্টগুলোর এই গ্লোবাল বডি মহুয়া মৈত্রর সঙ্গে ঘটা এই ঘটনাটি নিয়ে আরও অনুসন্ধান চালাবে বলে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত যাতে ভারতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে জানানো হয়, লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে সেই অনুরোধও জানিয়েছে আইপিইউ। বিবিসি বাংলা
টিএম