বিজ্ঞাপন

সালমান শাহকে হারানোর তিন দশক

সালমান শাহর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও কালজয়ী প্রভাবের নেপথ্যে

সালমান শাহর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও কালজয়ী প্রভাবের নেপথ্যে

সালমান শাহ—বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এবং আক্ষেপের নাম। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ারে বদলে দিয়েছিলেন ঢালিউডের গতিপথ। কিন্তু তার আচমকা রহস্যমৃত্যুতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সেই সম্ভাবনা। আজ এই কালজয়ী অভিনেতার রহস্য-মৃত্যুর তিন দশক। ১৯৯৬ সালের আজকের দিনেই তিনি চলে গেছেন অনন্তলোকে। কেন এত জনপ্রিয় সালমান শাহ? কেন মৃত্যুর তিন দশক পরও তাকে ঘিরে চর্চার কমতি নেই? অনেকের ভিড়ে তিনি কেন অনন্য? এসব প্রশ্ন রাখা হয় চলচ্চিত্র গবেষক ও আলোকচিত্রশিল্পী মীর শামসুল আলম বাবুর কাছে; সালমানের সঙ্গে যার ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল। ঢাকা পোস্টের কাছে অভিজ্ঞতা, যুক্তি ও ব্যাখ্যায় তিনি বর্ণনা করলেন সালমান শাহকে… 

প্রথম কথা হলো, তার ন্যাচরাল অভিনয়। দ্বিতীয়ত, তিনি যে সময়টায় এসেছিলেন, সেই সময়টা বুঝতে হবে। তখন মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছিল। স্বাধীনতার প্রায় ২০ বছর হয়ে গিয়েছিল। সাধারণভাবে বড় কোনো ঘটনার ২০-২৫ বছর পর একটা জেনারেশন চেঞ্জ হয়। ওই পরিবর্তনটাই তখনকার দর্শকরা চাইছিল। এর আগে রাজ্জাক, জসিম, সোহেল রানার মতো বয়স্ক নায়কেরা শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু তখনকার মানুষ নতুন মুখ চাচ্ছিল। সেই জায়গায় নতুন মুখ হিসেবে শাবনাজ ও নাঈমও এসেছিলেন। তারা নতুন হলেও তাদের মধ্যে ন্যাচরাল অভিনয়টা তুলনামূলক কম ছিল। এর একটা কারণ, নির্মাতারাও কিছুটা বয়স্ক ছিলেন। এরপর যখন সালমান শাহ এলেন, তার পরিচালক সোহান ভাইও তুলনামূলকভাবে ইয়াং টাইপের ছিলেন। ফলে মানুষ যে জিনিসটা চাচ্ছিল প্রেম, নতুন এবং ফ্রেশ মুখ সেটা সালমান ও মৌসুমীর মধ্যে পাওয়া গেল।

এরপর একটা নতুন ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছিল। ওই সময় যারা নতুন আসছিল, তাদের মধ্যে সালমানের অভিনয় ছিল ন্যাচরাল, তার ফ্যাশন সেন্স ছিল এবং তার চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আলাদা একটা ব্যাপার ছিল। তার ছবিগুলোকে শুধু প্রেমের গল্প বললে হবে না। সবগুলোই হয়তো প্রেমের গল্প, কিন্তু সবগুলোর মধ্যে আলাদা ধরনের একটা বিষয় ছিল। সাধারণ প্রেমের গল্প বলতে নায়ক-নায়িকার দেখা হলো, প্রেম হলো, পরিবার বাধা দিল, পরে আবার তাদের মিলন হলো এই ধরনের গল্প। কিন্তু সালমানের ছবিগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই কাঠামোর মধ্যেও আলাদা আলাদা কিছু করার চেষ্টা ছিল। এই জায়গাটাই তাকে অন্যদের মধ্যে আলাদা করেছিল। 

একটা ফুল পুরোপুরি ফোটার আগেই যদি সুবাস ছড়াতে শুরু করে, কিন্তু ফুলটা ফোটার আগেই ঝরে যায়, তাহলে তার যতটুকু সুবাস ছড়িয়েছে, মানুষ সেটাকেই ধরে রাখে। সালমান শাহর ক্ষেত্রেও আমার কাছে ব্যাপারটা অনেকটা এমন।

নাঈম কিংবা আমিন খানও অবশ্য আলাদা করে নজর কাড়তেন। কারণ তাদের ছবিগুলোও আলাদা ছিল, নির্মাতাদের স্টাইলও আলাদা ছিল। অভিনয়, ড্রেস, উপস্থাপন সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু সালমানের মধ্যে ওই সময়ের দর্শকের চাওয়া নতুনত্বটা খুব স্পষ্ট ছিল।

সালমান শাহ। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবু

আরেকটা বিষয় আছে, যেটা এখনকার মানুষ হয়তো বুঝবে না। সেটা হলো, এখন সালমান শাহ যতটা জনপ্রিয়, ওই সময়টা কিন্তু তিনি ঠিক ততটা জনপ্রিয় ছিলেন না। কারণ তার জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত পর্যায় দেখার মতো সময়ই তিনি পাননি। একজন মানুষ জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সময় লাগে। সেই সময়টা আসার আগেই তিনি চলে গেছেন। যার ফলে তার মধ্যে একটা ইনোসেন্ট ইমেজ রয়ে গেছে।

একজন শিল্পী যদি দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকেন, তাহলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার ইমেজও পরিবর্তন হয়। তার মধ্যে পরিপক্বতা আসে, চরিত্র বদলায়, কাজ বদলায়। সালমানের সেই সময়টাই আসেনি। ফলে একটা নির্দিষ্ট বয়স ও ইমেজের মধ্যে তিনি আটকে গেছেন। এ কারণেই তাকে ঘিরে একটা মিথ তৈরি হয়েছে। একটা ফুল পুরোপুরি ফোটার আগেই যদি সুবাস ছড়াতে শুরু করে, কিন্তু ফুলটা ফোটার আগেই ঝরে যায়, তাহলে তার যতটুকু সুবাস ছড়িয়েছে, মানুষ সেটাকেই ধরে রাখে। সালমান শাহর ক্ষেত্রেও আমার কাছে ব্যাপারটা অনেকটা এমন। সে পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই চলে গেছে। তার যে সম্ভাবনা, তার যে সুবাস, সেটাই তাকে মিথের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

সালমানের ছবিগুলো চলছিল, কারণ ছবিগুলো ছিল নতুন ধরনের। আবার তার ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এসে কিছুটা পরিপক্বতাও তৈরি হচ্ছিল। তখন তার যে পরবর্তী ছবিগুলো আসছিল, সেগুলোর গল্প একটার সঙ্গে আরেকটার পুরোপুরি মিল ছিল না। প্রত্যেকটার মধ্যে আলাদা একটা ধারণা ছিল। যে ছবিগুলো তৈরি হচ্ছিল, যে ছবিগুলো তিনি করতে চাচ্ছিলেন, যেগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছিলেন কিন্তু কাজ হয়নি কিংবা যেগুলো অর্ধেক কাজ হয়েছিল এসবের মধ্যেও একটা ভিন্ন ধরনের চিন্তা দেখা যাচ্ছিল। কোথাও এক ধরনের স্বপ্নের নায়ক, কোথাও অন্য রকম চরিত্র। প্রত্যেকটার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার ছিল। 

সালমানের সময় ছিল খুব কম। মাত্র তিন-চার বছরের ক্যারিয়ারে সে যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এখন অনেক আধুনিক। তারা খুব দ্রুত বুঝতে পারে কার মধ্যে কী সম্ভাবনা আছে। সালমানের মধ্যে মানুষ সেই সম্ভাবনাটা দেখেছে। এই কারণেই তার ভক্ত দিনে দিনে বাড়ছে।

অন্য নায়কদের ক্ষেত্রেও অবশ্যই গুণ ছিল। কিন্তু সালমানের মধ্যে শিক্ষার একটা প্রভাব, কথাবার্তায় আলাদা প্রস্তুতি, ছবিতে নিজেকে উপস্থাপনের সচেতনতা ছিল। নাঈমের কথাও বলা যায়। নাঈমের মধ্যে শিক্ষা ছিল, কিন্তু সেই শিক্ষার চাপটা কথাবার্তা ও ছবিতে যে ধরনেরভাবে দেখা গেছে, সেটাও আলাদা একটা বিষয়। সালমানও নিজেকে আরও বদলাতে চাইছিল। কিন্তু তার সেই সময়টা আসার আগেই সে চলে যায়। ফ্যাশনের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সালমানের ফ্যাশন দুর্দান্ত ছিল। কারণ ওই সময় মানুষ চেঞ্জ হচ্ছিল। স্বাধীনতার পর একটা সময় যেমন আলাদা ধরনের পরিবর্তন এসেছিল, তার ২০-২৫ বছর পর আবার নতুন একটা পরিবর্তন আসছিল। তখন মানুষের রুচি বদলাচ্ছিল।

‘স্বপনে ঠিকানা’ সিনেমার শুটিং-এ নৃত্য পরিচালক আমির হোসেন বাবু, শাবনূর, সালমান শাহ। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবু

স্বাধীনতার পরপর ‘রংবাজ’ ধরনের ছবি বেশি এসেছে, মারামারি বেড়েছে, একটা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সিনেমা হয়েছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের চাহিদা বদলেছে। তখন মানুষ বাইরের দুনিয়ার জিনিসপত্র দেখতে শুরু করেছিল। ইন্টারনেট তখনও আসেনি, কিন্তু স্যাটেলাইট টেলিভিশন আসছিল। ফলে বাইরের ফ্যাশন, বাইরের জীবনযাপন, বিদেশি জিনিসপত্র এসব মানুষের সামনে আসছিল।

সালমান ওই পরিবর্তনটা বুঝতে পেরেছিল। সে মাথায় পট্টি বাঁধছে, জ্যাকেট পরছে, আলাদা পোশাক পরছে, আলাদা স্টাইল করছে। মানুষ তো নতুন একটা জিনিস চায়। সালমান সেই নতুন জিনিসটা দিতে পারত। এটা প্রতি মুহূর্তে করার চেষ্টা করত। তবে সালমান তখনো রাজ্জাকের মতো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। রাজ্জাক বহু বছর কাজ করার মধ্যে দিয়ে নিজের ইমেজ বদলেছেন। তার ‘কালো গোলাপ’, ‘পাগলা রাজা’, ‘রংবাজ’, ‘বেইমান’, বিভিন্ন ধরনের ছবি আছে। তিনি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন করেছেন। আর সালমান মাত্র তিন বছরের মধ্যে এগুলো করার চেষ্টা করছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে সফলও হয়েছে। পর্দায় তার সেই পরিবর্তনের চিহ্ন আছে।

সালমান যদি বেঁচে থাকত, তাহলে এই পরিবর্তনের সময় সে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিত, সেটা দেখার বিষয় ছিল। আমার মনে হয়, পরিবর্তন অবশ্যই হতো এবং ভালো দিকেই হতো। এখন ঢাকাই সিনেমা যে অবস্থায় আছে, সেই একই অবস্থায় থাকত না।

সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিষয়টা একটু কঠিন। কারণ প্রভাব রাখার মতো চূড়ান্ত জায়গায় যাওয়ার আগেই সে চলে গেছে। একজন মানুষ বা শিল্পী একটা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যেতে পারে, কিন্তু সালমান সেই জায়গায় যাওয়ার আগেই চলে গেছে। তাই তার প্রভাব যতটা না তার জীবদ্দশায় দেখা গেছে, তার চেয়ে বেশি দেখা গেছে মৃত্যুর পরে।

‘আঞ্জুমান’ সিনেমার মহরতে বামে সালমান শাহ, মাঝে অভিনেত্রী শাবনাজ, ডানে চলচ্চিত্র পরিচালক হাফিজ উদ্দিন ।ছবি: মীর শামসুল আলম বাবু

আমাদের চলচ্চিত্রে পাশের দেশ ভারতের প্রভাব সব সময়ই বেশি। সালমানের আগমনের শুরুতে ভারতীয় নায়ক আমির খানের একটা ছায়া ছিল। আমির খান প্রথম দিকে একটা লাভার বয় ইমেজ ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু শাহরুখ খান বারবার নিজেকে পরিবর্তন করেছেন। ‘দিওয়ানা’, ‘ডর’ প্রতিটি ছবিতে আলাদা ধরনের চরিত্র দেখা গেছে। সালমানের মধ্যেও ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তনের প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল।

‘স্বপ্নের নায়ক’-এর মতো ছবিতে যেমন দেখা যায়, সেখানে সে একটা পর্যায়ে ভিলেন ছিল। ছবিটা পরে অন্যভাবে তৈরি হয়েছে। সেখানে দুই ধরনের চরিত্র ছিল। একটা চরিত্রে আমিন খান কাজ করেছে, কিন্তু খারাপ চরিত্রটা সালমান আগেই করেছিল। এর মধ্যেও তার ইমেজের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। আমার কাছে সালমানকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সে শুধু একটা নির্দিষ্ট ধরনের নায়ক হয়ে থাকতে চাইছিল না। তার মধ্যে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা ছিল। প্রত্যেকটা ছবি, প্রত্যেকটা চরিত্রের মধ্যে আলাদা কিছু দেওয়ার চেষ্টা ছিল।

আর তার প্রভাবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, এখনো এমন অনেক সালমান শাহর ভক্ত আছে, যারা তার সমসাময়িকই ছিল না। অনেকের বয়স ২৬, ২৭, ২৮ বছর। তারা সালমানকে জীবনে দেখেনি। এমনকি তাদের কেউ কেউ তার মৃত্যুর পর জন্মেছে। অথচ তারা তার ভক্ত। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এর মানে হলো, তার প্রভাব শুধু ওই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও একটা প্রভাব রেখে গেছে। তারা এমন একজন নায়ক খুঁজছিল, যে তাদের সময়ের সঙ্গে মানানসই হবে। পরে তারা পুরোনো ছবিতে সালমানকে আবিষ্কার করেছে এবং মনে করেছে, তারা যে জিনিসটা চায়, সেটা এই মানুষটার মধ্যেই আছে।

সালমান বলেছিল, তাকে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সে বলেছিল, ‘আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি যদি মারা যাই, তাহলে আপনারা টের পাবেন। ভারতীয় নায়ক-নায়িকারা আমাদের দেশের ছবিতে অভিনয় করবে।’

আগে একটা ছবি হলে চলার পর শেষ হয়ে যেত। পরে আর দেখার সুযোগ থাকত না। রাজ্জাকের অনেক ছবি এ কারণে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সহজে পৌঁছায়নি। কিন্তু এখন ইন্টারনেটের কারণে মানুষ যেকোনো সময় যেকোনো ছবি দেখতে পারে। যে ছবিটা দেখতে চায়, সেটা খুঁজে দেখতে পারে। ফলে নতুন প্রজন্ম পুরোনো শিল্পীদের নতুন করে আবিষ্কার করছে।

এই জায়গায় সালমান শাহর একটা সুবিধা হয়েছে। তার অভিনয়, ক্যারিয়ার, নড়াচড়া, কথাবার্তা, প্রতিটি ছবির লুক, এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ ডেলিভারি, জামাকাপড়, হাঁটাচলা সবকিছুর মধ্যে ভবিষ্যতের একজন নায়কের প্রতিচ্ছবি ছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই জিনিসটা এখন আবিষ্কার করছে। একটা সমস্যা ছিল, তার চুল পড়ে যাচ্ছিল। এটা নিয়ে তার চিন্তা ছিল। ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তি এলে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করা যাবে এমন চিন্তাও ছিল বলে আমরা শুনেছি। ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে তার মধ্যে একটা সচেতনতা ছিল। সে নিজেকে পরিবর্তন করতে চাইত।

চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সালমান শাহ । ছবি: মীর শামসুল আলম বাবু

বাংলাদেশে নিজেকে পরিবর্তন করা সহজ না। একজন শিল্পী একটা চরিত্রে সফল হলে পরিচালকরা অনেক সময় তাকে বারবার সেই একই ধরনের চরিত্রে ব্যবহার করতে থাকেন। ইলিয়াস কাঞ্চন বা অঞ্জুর ক্ষেত্রেও আমরা এরকম দেখেছি। একটা চরিত্র বা ইমেজ জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটাই বারবার ব্যবহার করার প্রবণতা থাকে। রাজ্জাকও অবশ্য পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘ সময় ধরে করেছেন।

সালমানের সময় ছিল খুব কম। মাত্র তিন-চার বছরের ক্যারিয়ারে সে যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ এখন অনেক আধুনিক। তারা খুব দ্রুত বুঝতে পারে কার মধ্যে কী সম্ভাবনা আছে। সালমানের মধ্যে মানুষ সেই সম্ভাবনাটা দেখেছে। এই কারণেই তার ভক্ত দিনে দিনে বাড়ছে। সালমান বেঁচে থাকলে ঢাকাই সিনেমার গতিপথ কতটা বদলে যেত, এটা বলা কঠিন। কারণ এটা সম্পূর্ণ হাইপোথেটিক্যাল। যেমন জহির রায়হান বেঁচে থাকলে কী হতো, সেটাও বলা কঠিন। একজন শিল্পীর পরিচিত কাজ যেমন থাকে, তেমনি দুর্বল কাজও থাকতে পারে। 

সালমানের ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমেজ অবশ্যই বদলাত। মানুষকে বছরের পর বছর একই ইমেজে রাখা সম্ভব নয়। তার মধ্যেও পরিবর্তন আসত। ভিন্ন ধরনের গল্প, ভিন্ন স্টাইল, ভিন্ন চরিত্রের ছবি আসত। তারপর স্যাটেলাইট এলো, বেসরকারি টেলিভিশন এলো, ইন্টারনেট উন্মুক্ত হলো। বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। সেই প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি। কিন্তু সালমান যদি বেঁচে থাকত, তাহলে এই পরিবর্তনের সময় সে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিত, সেটা দেখার বিষয় ছিল। আমার মনে হয়, পরিবর্তন অবশ্যই হতো এবং ভালো দিকেই হতো। এখন ঢাকাই সিনেমা যে অবস্থায় আছে, সেই একই অবস্থায় থাকত না।

শিশু সালমান শাহ। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবুর সংগ্রহ

সালমানের সঙ্গে আমার খুব বেশি দেখা হয়নি। তার বাসা ছিল গ্রিন রোডে, পান্থপথের কাছাকাছি। আমরা কলাবাগানে থাকতাম। একই এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় মাঝে মাঝে দেখা হতো। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর মহরতে আমি ছিলাম। সেখানে ছবি তুলেছি। পরে বিভিন্ন শুটিংয়ে গিয়ে এক-দুইটা ছবি তুলেছি। তখন তো আজকের মতো সেলফি বা মোবাইল ক্যামেরা ছিল না। র‌্যান্ডম ছবি তোলার সুযোগও ছিল না। পরিচিত মানুষ হিসেবে দেখা হলে দু-একটা কথা হতো। ‘কী খবর, কেমন আছো? এই ছবিটা দিও’; এই ধরনেরই দেখা-সাক্ষাৎ ছিল।

মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে একটা প্রেস কনফারেন্সে আমিও ছিলাম। সেখানে সালমান বলেছিল, তাকে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সে বলেছিল, ‘আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি যদি মারা যাই, তাহলে আপনারা টের পাবেন। ভারতীয় নায়ক-নায়িকারা আমাদের দেশের ছবিতে অভিনয় করবে।’ সেই প্রেস কনফারেন্সের ছবিও আমি তুলেছিলাম।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালমান শাহর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার 'কেয়ামতের থেকে কেয়ামত' দিয়ে শুরু হলেও, তিনি রূপালী সিনেমার ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়িয়েছিলেন অন্য একটি প্রজেক্টে, যেটা কখনোই মুক্তি পায়নি।

১৯৮৮ সালে চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড' / 'রূপসী মা'-এর সেটে তরুণ সালমান শাহ। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবুর সংগ্রহ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির ১৯৮৮ সালে ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (যা পরবর্তীতে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন) উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সিনেমায় ‘রইস’ নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে প্রথম শুটিং করেছিলেন সালমান শাহ।। ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে আলমগীর কবিরের আকস্মিক প্রয়াণে সেই সিনেমার শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। 

আলমগীর কবির মারা যাওয়ার পর তার অনেক ছবি ও ডকুমেন্টারি ধরনের উপকরণ আমার কাছে ছিল। সেখানেই আমি সালমানের ওই অংশটা পেয়েছিলাম। বিষয়টি পরে শাহীন মাহমুদের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছিল। একদিন সালমানের সঙ্গেও এটা নিয়ে কথা হয়েছিল।

'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড' -এর সেটে তরুণ সালমান শাহ। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবুর সংগ্রহ

এমনকি মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে এক আড্ডায় কথা উঠেছিল, টেকনাফের ঐতিহাসিক ‘মাথিনের কূপ’-এর কালজয়ী ভালোবাসার গল্প নিয়ে সিনেমা বানানোর। সেখানে ঠাট্টাচ্ছলে সালমানের স্ত্রী সামিরাকে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার কিছুদিন পরই ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে হঠাৎ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়ে আসে সালমান শাহর অকালমৃত্যুর খবর।

মারা যাওয়ার তিন-চার কিংবা পাঁচ মাস আগে একটা ডিনার আড্ডায় ‘মাথিনের কূপ’ নিয়ে সিনেমা বানানোর কথাও আলোচনা হয়েছিল। সত্য ঘটনা নিয়ে বড় পরিসরে সিনেমা করার কথা ভাবছিলাম। সালমানকে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। সামিরাকেও একটি চরিত্রে নেওয়ার কথা আলোচনা হয়েছিল। সেটা অবশ্য আড্ডার মধ্যে হওয়া একটি পরিকল্পনাই ছিল।

সালমানের মৃত্যুর খবর আমি টেলিভিশনের মাধ্যমে পেয়েছিলাম। সেদিনই ক্যামেরাম্যানদের একটা ডিনার পার্টি ছিল। ম্যানকিন রেস্টুরেন্টে সবাই ছিলাম। তখন আলোচনা হচ্ছিল, কে জানাজায় যাচ্ছে, কে কোথা থেকে আসছে। আমি অবশ্য জানাজায় যেতে পারিনি।

এমআইকে/কেআই