বৃদ্ধ নিবাসে বাবা, ঈদেও খোঁজ নেন না ছেলে

দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদকে ঘিরে মুসলিম উম্মাহ আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হলেও তার ছিটেফোঁটা নেই বৃদ্ধ নিবাসে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনের শেষ দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন বাবারা। তাই জীবনের শেষ মুহূর্তে একটাই ইচ্ছে সন্তানদের সঙ্গে নিজ বাড়িতে ঈদ উদযাপন করবেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে পরিবারের বোঝা হওয়ায় বাবাদের বাড়িতে নেন না তাদের আদরের সন্তানরা। এ যেন সব থেকেও কিছুই নেই তাদের। তারপরও সন্তানদের প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই বাবাদের।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছে ভোলা সদর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর কাঠালি নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশন পরিচালিত বৃদ্ধ নিবাসে।
জানা গেছে, ২০১০ সালে যাত্রা শুরু হওয়া বৃদ্ধ নিবাসটিতে বর্তমানে ২২ জন বৃদ্ধ বাবা রয়েছেন। যাদের অনেকের সন্তান, পরিবার-পরিজন, ভিটেমাটি সবই রয়েছে। তারা সকলেই ভোলা জেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। একটা সময় তাদের উপার্জনের টাকায় সন্তানদের লালন পালন করলেও বৃদ্ধ বয়সে ঠাঁই হয়নি নিজের উপার্জিত অর্থে বানানো ঘরে। শেষ বয়সে পরিবারগুলো এসব বাবাদের বোঝা মনে করার কারণে তারা নিজেরাই স্বেচ্ছায় ঠাঁই নিয়েছেন বৃদ্ধ নিবাসে। যাদের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, ওষুধসহ সকল ব্যয় বহন করে নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশন।
বিজ্ঞাপন
কথা হয় ১ যুগ ধরে বৃদ্ধ নিবাসে থাকা ৮০ বছর বয়সী আব্দুর রহমানের সঙ্গে। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, রিকশা চালিয়ে উপার্জন করে ছেলেদের খাইয়ে বড় করেছি। বিয়ে করিয়েছি। আস্তে-আস্তে আমার শরীরের শক্তি কমতে শুরু করে। রোজগার করার শক্তি হারিয়ে ফেলার কারণে সন্তানদের চোখে অচল হয়ে গিয়েছি। যার কারণে সংসারে মূল্যহীন হয়ে পড়ি।
ভাঙাস্বরে ৮৫ বছর বয়সী মো. সামসুল হক বলেন, একটি মাত্র ছেলে আমার। ঠিকমতো খেতে দেয় না। একবেলা ভাত খেতে দিলে অন্য বেলায় দেয় না। যার কারণে নিজের ইচ্ছায় বৃদ্ধ নিবাসে এসেছি। ছেলে একটু খোঁজ নিতেও আসে না।
বিজ্ঞাপন
কমবেশি একই চিত্র অন্যান্য বাবাদেরও। সন্তানরা খোঁজ নেন না তাদের। ছেলেরা তাদের স্ত্রী সন্তান নিয়ে আরাম আয়েশে দিন কাটান। ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়িতে নেওয়া তো দূরের থাক, দেখতেও আসেন না বাবাদের।
আক্ষেপ করে ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মালেক বলেন, আমার ৬ ছেলে। তারা ঢাকাতে কাজ করে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে ছেলেরা আমার খোঁজ নেয় না। আমি অসহায় হয়ে বৃদ্ধ নিবাসে ঠাঁই নিয়েছি।
বৃদ্ধ নিবাস থেকে খাবার, পোশাক ও চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান আব্দুল মন্নান। তিনি বলেন, ছেলে ঢাকাতে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালায়। বাড়ি থেকেও নেই, যাব কোথায়? ঈদে বাড়ি যাব না, বৃদ্ধ নিবাসে আমার মতো যারা আছেন সকলের সঙ্গে এখানেই ঈদ করব।
আরও পড়ুন
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছেলে বাড়িতেই আসে না। আমাকে বাড়িতে নেবে কীভাবে।
কাজি ফারুক ও দুলাল বলেন, সামনে ঈদ আসছে। পরিবারে সাথে ঈদ উদযাপন করতে মনে চায়। কিন্তু ছেলেরা এসে বৃদ্ধ নিবাস থেকে বাড়িতে নেয় না। মনে চায় ছেলেদের সঙ্গে ঈদ করতে।
নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশনের বৃদ্ধ নিবাসের ম্যানেজার সালেহ উদ্দিন সেলিম বলেন, ২০১০ সালে বৃদ্ধ নিবাসের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১২ সালে ১৩৮ জন বৃদ্ধ এখানে এসেছিলেন। বর্তমানে ২২ জন বৃদ্ধ রয়েছেন। প্রতি ঈদে তাদের নতুন পোশাক দেওয়া হয়। এবারও দেওয়া হবে। তারা বৃদ্ধ নিবাসেই ঈদ করেন।
তিনি আরও বলেন, তাদের সকল ধরনের খরচ বহন করে নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশন। এখানকার সকল বৃদ্ধ পরিবারে অবহেলিত। তাদের বাড়িতে বোঝা মনে করা হয়।
এদিকে ছেলেরা ভুল বুঝতে পেরে বাবাদের বৃদ্ধ নিবাস থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেবেন বলে আশায় বুক বেঁধে আছেন বৃদ্ধ নিবাসের বাবারা। তারা জীবনের শেষ সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে সুখে- দুঃখে কাটাতে চান।
খাইরুল ইসলাম/আরএআর