সিন্ডিকেটে বন্দি তরমুজ, ন্যায্যমূল্য জোটেনি ভোলার চাষিদের ভাগ্যে

প্রতিবছর তরমুজ চাষ করি, এটা আমার পেশা, চার মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করি। ফসল যখন বিক্রির সময় হয় তখন ফসল বিক্রির জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয় না। এতে সিন্ডিকেটের মধ্যে পড়ে কমমূল্যে তরমুজ বিক্রি করতে হয়। যে দাম পাওয়ার কথা সে দাম পাই না।
এ বছর ক্ষেতে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে নিজের হতাশার কথা বলছিলেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানার তরমুজ চাষি মাহবুব আলম।
এদিকে ক্ষেতে তরমুজের বীজ বপন থেকে শুরু করে তরমুজ বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কৃষকদের পাশে না থাকার অভিযোগ উঠেছে ভোলা কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে। এতে তরমুজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ চাষিরা। ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে কেউ কেউ ছেড়েছেন তরমুজের চাষাবাদ। তবে চাষিদের সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে দাবি ভোলা কৃষি বিভাগের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী আবহাওয়া ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় ভোলার ৭ উপজেলার চরাঞ্চলে এ বছর তরমুজের বাম্পার ভালো হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৫০ টন উৎপাদন হয়েছে। বাম্পার ফলন হলেও আড়ৎদার ও পাইকারদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে চাষিরা বাজারে তরমুজের ন্যায্য দাম পান না, যার পাঁচ তৃতীয়াংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। ফলে লাভের মুখ দেখা হয় না চাষিদের।
ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) তথ্য মতে, ভোলা জেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তরমুজের আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫৮ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৫০০ হেক্টরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৩৮৩ হেক্টরে ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১ হাজার ২৪৯ হেক্টরে। যা বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ভোলায় তরমুজের সর্বোচ্চ আবাদ হয়েছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে, আর সর্বনিম্ন ২০২০-২১ অর্থবছরে।
সরেজমিনে ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের চর চটকিমারা, ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চর ব্যাংকের জমা চর, চর রাবেয়া ও দৌলতখান উপজেলার মদনপুর চরে গিয়ে দেখা যায়, খোলা আকাশের নীচে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। বিগ ফ্যামিলি, থাই সুপার, ড্রাগন সুপার, ড্রাগন কিংসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজের চাষ করেছেন চাষিরা। প্রতিটি তরমুজ গাছে একটি করে ৫ কেজি থেকে শুরু করে ১৫ কেজি পর্যন্ত তরমুজ রয়েছে। সেই তরমুজ বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে ট্রাক্টরের সাহায্যে নদীর কিনারায় নোঙর করে রাখা ট্রলার ভর্তি করছেন। এরপর এসব তরমুজ নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন আড়তে। আড়তে নিয়ে বিক্রির পরই খরচ বাদে হিসেব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চাষিদের।
কৃষকদের অভিযোগ আড়ৎদার ও পাইকারদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের প্রতি পিস পরিপক্ব তরমুজ আড়তে বিক্রি করতে হয় দেড় থেকে সর্বোচ্চ দুইশ টাকা দরে। ৫ থেকে ৭ কেজি ওজনের একশ তরমুজ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ও ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের একশ তরমুজ সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। চাষিদের কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগীরা একই তরমুজ কিনে বাজারে খুচরা ক্রেতাদের কাছে প্রতি পিস বিক্রি করেন আকারভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের ধরে তরমুজসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ করেন ভোলা সদর উপজেলাধীন ইলিশা ইউনিয়নের সাহাবুদ্দিন ফরাজি। তিনি বলেন, এ বছর ৪০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকার কারণে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় ফসল ভালো হয়েছে। সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারলে লাভবান হব।
চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানাধীন নুরাবাদ ইউনিয়নের তরমুজ চাষি মো. মনির বলেন, তিন একর জমিতে এ বছর তরমুজ চাষ করেছি। ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেতের অর্ধেক তরমুজ কেটে বিক্রি করেছি, কিন্তু ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আমাদের থেকে অল্পদামে কিনে একই তরমুজ বাজারে তিন গুণ বেশিদামে বিক্রি করে। যদি সিন্ডিকেট মুক্ত বাজারে তরমুজ বিক্রি করতে পারি তাহলে লাভবান হব। বর্তমানে যে দামে তরমুজ বিক্রি করি এতে উৎপাদন, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বাদ দিলে আমাদের ভাগে কিছুই থাকে না।
চাষি মো. নাসিম বলেন, ধারদেনা করে আমরা তরমুজের চাষ করেছি। আড়তে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের একশ তরমুজের দাম পাই সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। বিভিন্ন খরচ বাদে হাতে পাই ১৩ হাজার টাকা। ১০ কেজি ওজনের নিচের তরমুজ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়।এতে আমরা লাভবান হচ্ছি না। আরেকটু বেশি দামে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভবান হতাম। আমরা ন্যায্য দাম পাইতেছি না। এতে তরমুজ চাষিরা টিকতে পারছেন না ফলে চাষের পরিমাণ বাড়ছে না।
চাষিদের অভিযোগ অস্বীকার করে বাজারে সিন্ডিকেট নেই দাবি করে আড়তদাররা বলছেন, আড়তে তরমুজের দাম নির্ধারণ করে পাইকাররা। আড়ৎদার মো. কামরুল ও নুরুল হুদা ও ফরিয়া মো. ইব্রাহিম বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে তরমুজ আড়তে আসার পর আকারভেদে প্রতি শত হিসেবে তরমুজ নিলামে তোলা হয়। আড়ৎ থেকে ফরিয়ারা কিনে নিয়ে খুচরা বিক্রি করে। সেখানে নির্ধারিত দাম নেই। কেনা দাম অনুযায়ী তরমুজ বিক্রি করেন। তরমুজের দাম বাড়লে খুচরা বাজারে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে হয়।
এদিকে এ বছর চাষিরা সব দিক থেকে লাভবান এবং তাদের সহায়তা করা হচ্ছে জানিয়ে ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, প্রতি হেক্টরে ৫০ টন তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। কৃষক সব দিক লাভবান। আগামীতে উন্নতমানের বীজ, বীজের পরীক্ষা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে তরমুজের আবাদ বাড়াতে আমরা সচেষ্ট থাকব। জেলা উপজেলা পর্যায়ে তরমুজের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষেও সচেষ্ট থাকব।
কৃষক তরমুজের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্যে কাজ করছেন জানিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভোলা জেলার সহকারী পরিচালক নুর হোসেন বলেন, খুচরা বাজারে তরমুজের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতেও আমরা কাজ করছি। তরমুজের ক্রয়মূল্য ভাউচার ও বিক্রয়মূল্য তদারকি করব। যদি কেউ অযাচিতভাবে তরমুজের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে সিন্ডিকেট মুক্ত বাজারে তরমুজ বিক্রি করতে পারলে এ বছর ব্যাপক পরিমাণে লাভবান হওয়ার আশা তরমুজ চাষিদের। প্রয়োজন সরকারিভাবে কঠোর বাজার মনিটরিং। এতে আগামীতে ভোলায় তরমুজ চাষের পরিমান বাড়ার পাশাপাশি আরও বেশি সমৃদ্ধ হবে ভোলার কৃষি অর্থনীতি বলে মনে করেন তরমুজ চাষিরা।
খাইরুল ইসলাম/আরকে