‘নদীর পানি খেয়েই বেঁচে আছি’

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুর উপজেলার হাজারো মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সরকারি টিউবওয়েল থাকলেও অধিকাংশ অকেজো হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে দূষিত নদীর পানি ব্যবহার করছেন তারা। এতে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। রমজান মাসে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। রোজাদারদের জন্য ইফতার ও সেহরিতে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
শিমুলবাক গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পাশের ছোট নদী থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা পানি সংগ্রহ করছেন। এই নদীর পানিতেই চলছে খাওয়া, রান্না, কাপড় ধোয়া ও গবাদিপশুর গোসল। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে বাধ্য হয়েই এই দূষিত পানি ব্যবহার করছেন তারা।
স্থানীয় গৃহবধূ ফাতেমা বলেন, আমরা এখন নদীর পানি খেয়েই বেঁচে আছি। আশপাশে অনেকের টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। যাদের বাসায় টিউবওয়েল আছে, তারা অনেক সময় খারাপ আচরণ করে, পানি নিতে দেয় না।
একই গ্রামের বাসিন্দা বাছির আলী বলেন, টিউবওয়েল পেয়েছিলাম, প্রথমে ঠিকই পানি উঠত, কিন্তু কয়েক মাস পর থেকে একদম বন্ধ। নতুন করে বসানোর সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পানি ব্যবহারের ফলে অনেক ঘরেই ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও পেটের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
রমজান মাসে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রোজাদারদের জন্য সাহরি ও ইফতারে বিশুদ্ধ পানি অপরিহার্য হলেও দূষিত পানি পান করেই দিন কাটছে অনেকের।
শান্তিগঞ্জের বাসিন্দা মুক্তাদির বলেন, রোজায় পানি সবচেয়ে দরকারি। কিন্তু আমাদের দূষিত নদীর পানিই খেতে হচ্ছে। ইফতারে ঠান্ডা পানি তো দূরের কথা, বিশুদ্ধ পানি জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছি। অনেক সময় পানি ফুটিয়ে খেতে হয়, মাটির চুলার জন্য সেটাও সম্ভব হয় না।
একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাহানুর বলেন, রোজা রেখে পানি সংগ্রহ করতে অনেক দূর যেতে হয়। অনেক সময় ইফতারের সময়ও পানি আনতে যেতে হয়। শিশুদের জন্য এটা আরও কষ্টদায়ক।
২০১৯-২০ অর্থবছরে সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৫ হাজার ৮০০টি হ্যান্ড টিউবওয়েল স্থাপন করে।
কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে গেছে। এমনকি শান্তিগঞ্জে সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রীর নিজ বাড়ির সামনেই স্থাপিত ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ের টিউবওয়েল থেকেও পানি উঠছে না। সরকারি ৭ হাজার টাকা ফি দিয়ে অনেকেই টিউবওয়েল পেয়েছিলেন, কিন্তু এখন তা অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়রা বলছেন, তাদের জন্য এমন টিউবওয়েল বসানো হোক যা দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা না থাকলে জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রজব আলী বলেন, প্রতি বছরই আমরা এই সমস্যার কথা বলি, কিন্তু সমাধান হয় না। সরকার যদি কার্যকরভাবে এই সমস্যার সমাধান না করে, তাহলে আমাদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী নুর উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের বিষয়টি ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়নি। এসব জায়গায় হ্যান্ড টিউবওয়েল নয়, বরং সাব-মার্সিবল টিউবওয়েল বসানো বেশি কার্যকর হতো। ফলে এখন অধিকাংশ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, এখন নতুনভাবে স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে দ্রুতই এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তামিম রায়হান/আরএআর