আনন্দ মোহন কলেজে সংঘর্ষের ঘটনায় বহিষ্কার ৫ শিক্ষার্থী

ময়মনসিংহ নগরীর ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজে হলের সিট নবায়ন ইস্যুতে দুই দল শিক্ষার্থীর সংঘর্ষের ঘটনায় ৫ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৪ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়াসহ আরও ৪ জনকে সতর্ক করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় এতথ্য নিশ্চিত করেছেন কলেজের হল সুপার অধ্যাপক মো. শাহজাহান করিম সাজু।
এর আগে কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বিজ্ঞাপন
বহিষ্কৃতরা হলেন- ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম জনি, ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন অপু, একই বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মুকুল, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী খায়রুল ইসলাম এবং মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আলী আকবর।
কারণ দর্শানো নোটিশপ্রাপ্তরা হলেন- রুমন, মোস্তাক, তন্ময়, হৃদয় খান, রিয়াদ, রবিন, ফরহাদ, মুস্তাফিজুর রহমান, শাহিন, হুমায়ুন, পিয়াস, নাঈম, রাফি ও আল আমিনকে। তারা কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
বিজ্ঞাপন
এছাড়াও সংঘর্ষের জড়ানোর অভিযোগে কলেজ শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান, বাঁধন, দেলোয়ার ও রামিমকে সতর্ক করা হয়েছে।
হল সুপার অধ্যাপক মো. শাহজাহান করিম সাজু বলেন, সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বহিষ্কৃত পাঁচজনের সংঘর্ষের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তাদের হামলার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ৫ আগস্টের আগে অন্তত ৩৫ জন শিক্ষার্থী অবৈধভাবে বিভিন্ন হলের সিট দখল করে থেকেছে। তাদের পড়াশোনা শেষ হলেও সিট ছাড়েনি। তবে গত ৫ আগস্টের পর হল ছেড়েছে। এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে হলের সিট নবায়ন শুরু হয়ে এখনও চলছে। এখন থেকে বৈধ শিক্ষার্থীরাই হলে থাকতে পারবে।
এদিকে সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও শিক্ষার্থীরা সেটি এখনো জানেন না। আশিকুর রহমান ও বাধন নামের যে দুজনের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে, তারা হলের শিক্ষার্থী না বলে জানিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। তাদের রাজনৈতিক অথবা ছাত্র সংগঠনের পদবি আছে কিনা তা খোলাসা করছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে কলেজের একটি সূত্র জানায়, কলেজে ছেলেদের পল্লীকবি জসীম উদ্দীন হল, কবি নজরুল হল, ভাষাসৈনিক আহমেদ সালেক হল নামের তিনটি হল রয়েছে। এসব হলে ৩৭৫টি সিট রয়েছে। এছাড়া সুকান্ত হল নামের আরও একটি হল নির্মাণাধীন। আগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাদের শেল্টারে ছাত্র নয় এমন শতাধিক ছেলে হলে থেকেছে। এরই মধ্যে অন্তত ৩৫ জন হল ছেড়ে চলে গেছেন। ছাত্র নয় এমন আরও ৭৫ জনের সিট হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে যে চারজনকে সতর্ক করা হয়েছে তাদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ময়মনসিংহের অন্যতম সমন্বায়ক আশিকুর রহমানের নাম রয়েছে। আশিকুর রহমান ও বাধন নামের দুজন ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসা অন্য সবাই হলে থাকতেন। এর মধ্যে আশিকুর রহমান কলেজে অনার্স শেষ করেছেন। তিনি মাস্টার্সে ভর্তি হবেন।
আরও পড়ুন
জসীম উদ্দীন হলের শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, হল খোলার পর থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আমরা থাকছি। আগে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কলেজ শাখার নেতারা অনেককে তাদের মিছিলে যেতে বাধ্য করেছেন। এখন সেই পরিবেশ নেই। সবাই শান্তিতে পড়ালেখা করছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আমরা এখনও জানি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, সিট বরাদ্দের নবায়ন ফি সাত হাজার থেকে কমিয়ে ছয় হাজার ৫০০ টাকা করেছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে নবায়ন ফি এর চেয়ে আর কমানো হয়নি। কলেজ শান্তিপূর্ণ রাখার স্বার্থে সাধারণ ছাত্ররা আর আন্দোলনে নামবেন না। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ময়মনসিংহের অন্যতম সমন্বায়ক আশিকুর রহমান বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে আমাকে সতর্ক করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তবে আমার বক্তব্য স্পষ্ট—সবসময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, আগামীতেও থাকবো।
এ বিষয়ে আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমান উল্লাহ বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পড়ালেখা করছে। আর কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না, শিক্ষার্থীদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করছি।
এর আগে গত ১২ জানুয়ারি বিকেল ৫টার দিকে হলের সিট বরাদ্দের নবায়ন ইস্যুতে গণ্ডগোলের সূত্রপাত হয়। পরে ময়মনসিংহের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আশিকুর রহমানসহ অন্যরা এলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ ঘটনায় ওইদিন রাত ৮টার দিকে কলেজ ও হল বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করে কলেজ প্রশাসন।
এ ঘটনার পর গত ১৪ জানুয়ারি কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেদিনের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান খন্দকার রেজাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির সদস্যরা হলেন- সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রশিদুল আলম, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহীন কবির ও অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম।
অপরদিকে সংঘর্ষের ঘটনার ৩ দিন পর গত ১৬ জানুয়ারি সকালে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম আবার চালু হয় এবং গত ১০ ফেব্রুয়ারি বন্ধ থাকা হলগুলো খুলে দেয় কলেজ প্রশাসন।
মো. আমান উল্লাহ আকন্দ/এমএন