চাকরিতে কোটা বৈষম্য অবসানের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর থেকে ক্রমেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশকে নিয়ে নানাবিধ সংবাদ প্রচার করা হতে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব সংবাদের অধিকাংশই সরকার এবং শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি অবস্থানের জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সরকারের সমালোচনা করে আসছিল।

আন্দোলন যতই ঘনীভূত হচ্ছিল, সংবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব ততই বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে গত ৫ আগস্ট যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটল তা এককথায় সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠে। এই গুরুত্বের জায়গাটি প্রথমবারের মত উঠে আসে গত ১৬ জুলাই এই আন্দোলনকে ঘিরে সেসময়ের ছাত্রলীগের মুখোমুখি অবস্থান এবং পুলিশের তরফ থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেসময় বিবিসি, এফপি, এপি, আল জাজিরা, এনডিটিভি, রয়টার্স ইত্যাদি গণমাধ্যমগুলোতে চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬ জনের মৃত্যু ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদগুলো বিশেষ গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।

আল-জাজিরার মতো গণমাধ্যম এই আন্দোলনকে যৌক্তিক হিসেবে দাবি করে কোটা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সরকারের সমর্থকরাই বেশি লাভবান হচ্ছে বলে মন্তব্য করে। সেসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতার খবর দেয় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। এই ঘটনায়ও সেসময়ের সরকারি দলের কর্মীদের দায়ী করা হয়। পুলিশকে উদ্ধৃতি করে এফপির প্রতিবেদনে শতাধিক আহত হওয়ার খবর জানানোর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরকার-সমর্থকরা লাঠিসোঁটা এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার খবর দেওয়া হয়।

এ ধরনের অনেক সংবাদ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশের পর থেকে এই আন্দোলন নিয়ে গভীর দৃষ্টি রাখছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো। সবশেষে গত ৪ আগস্ট সরকারের পদত্যাগের দাবিতে একদফাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় একদিনে সর্বোচ্চ শতাধিক মানুষ নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষের আহতের পর ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের প্রাপ্তি তাদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়। পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন এভাবে এতটাই সহসা ১৫ বছরাধিককালের একটি সরকারের পতনের কারণ হবে, এটা আসলে অনুমানের অতীত ছিল। বিষয়টি যে কতটা দ্রুত হয়েছে তা আমরা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অবলোকন করেছি। একদা একটি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকারকে রীতিমতো জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে সরকার পতনের পর উঠে আসছে সরকারের নানা ধরনের দুর্নীতি এবং অব্যস্থাপনার খবর।

অথচ আমরা যদি সরকারের বিগত ১৫ বছর ৭ মাসের পথচলাকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব এই সময়ের মধ্যে সরকারবিরোধী অনেক আন্দোলনকে সফলভাবে দমন করা সম্ভব হয়েছিল। এখানেই আসলে সবচেয়ে বড় ভুলটা তারা করে ফেলেছিল। তারা এই আন্দোলনকে অতীতের রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন দমানোর মত করে মোকাবিলা করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করে ফেলেছে। এক্ষেত্রে ‘সরকার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামাতে পারছে না’ শিরোনামে দ্য ডিপ্লোম্যাট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো শিক্ষার্থী আন্দোলন করছে।

ইন্ডিয়া টুডে সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে সবচেয়ে বড় আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করেছিল। এই সময়ের মধ্যে দেশের ভেতর এবং বাইরে উভয় জায়গা থেকেই গণমাধ্যমগুলোতে শিক্ষার্থী মৃত্যুর বিষয়গুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে একপর্যায়ে ফুঁসে উঠতে থাকে দেশের সর্বস্তরের জনতা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে দেশের বাইরেও বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালিরা তাদের মত করে আন্দোলনে শরিক হতে থাকে। 

এখানে সরকারের পতনের পর বিদায়ী সরকারের বিগত সময়ের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচারে আসতে থাকলেও এটা বোধ হয় ধারণা করা অত্যুক্তি হবে না যে, কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যদি বিগত সরকারের পতন না হতো তাহলে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে যেত। সেক্ষেত্রে এর কৃতিত্ব সম্পূর্ণ ছাত্র-জনতার।

‘ইতিহাসের বদলার মুখে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘যেভাবে স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা, এতে করে তার এ ধরনের পরিণতিই প্রাপ্য ছিল।’ পত্রিকাটি তার স্বৈরাচারী আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধীদের দমন, সংবাদমাধ্যমে ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা ইত্যাকার বিষয়গুলো নিয়ে তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করে। এর বাইরেও নিউইয়র্ক পোস্ট এবং দ্য ডনের মতো গণমাধ্যমেও কাছাকাছি ধরনের সংবাদ পরিবেশিত হয়।

৫ আগস্ট সরকারের বিদায়ের পর ৮ আগস্ট রাত ৯টায় নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রায় ৮০ ঘণ্টা দেশ কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। এর মূল কারণ আসলে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজ। এর বাইরে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানকে স্বাগত জানাতে দেখেছি। সবার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে অভিনন্দন বার্তাটি আসে। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের এক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে এবং তাদের নিজেদের নিরাপত্তা জনিত কারণে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকেও পাঠানো অভিনন্দন বার্তা থেকে মনে করা যেতে পারে যে তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করে যেতে আগ্রহী।

তবে সরকারের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাঁধা বা সংকটের জায়গাটি হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাজনিত নিরাপত্তা সংকট এবং অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখো জনতার প্রতিবাদ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকারের প্রথম উপদেষ্টা পরিষদের সভায়ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের এই বাংলাদেশে কিন্তু এখনো প্রায় দেড় কোটি হিন্দু রয়েছেন, যারা এদেশরই নাগরিক। এদের আস্থায় না নিয়ে কোনোভাবেই দেশগড়ার কাজ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে তাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেসব গভীর, যার মোচনে দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই। আমাদের এখন প্রত্যাশা থাকবে, আমরা যেন আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম না হই। 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়